কিন্তু যখন ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এল, তখন একটা ভয় মানুষের মধ্যে কাজ করল যে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় চলে আসবে। তাঁরা ভাবলেন, এখন মমতাই পারেন বিজেপিকে আটকাতে। এ রকম অবস্থায় আপনারা বিকল্প কিন্তু দিতে পারেননি।

মহম্মদ সেলিম: আমাদের পর্যালোচনাও তা–ই।

এখানে প্রশ্ন, সিপিআইএমের মূল শত্রু কারা—তৃণমূল না বিজেপি?

মহম্মদ সেলিম: এটা নতুন করে আর আলোচনার কিছু নেই। তৃণমূল কংগ্রেস বলে কিছু আছে? তৃণমূল একটা প্ল্যাটফর্ম। মূল লড়াইটা হচ্ছে আরএসএসের সঙ্গে, যারা দেশকে একটা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। বিজেপি তার দল হিসেবে কাজ করছে। আরএসএস তাদের কর্মকাণ্ডকে নানা পন্থায় এগিয়ে নিয়ে যায়। তারই ধারাবাহিকতায় তৃণমূলের সৃষ্টি।

এটা কি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক বলে মনে হয়? যখন নির্বাচন আসে, তখন তৃণমূল এমনভাবে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার করে যে মনে হয় তারাই বিজেপির প্রধান বিরোধী। ভোট মেরুকরণ হয়ে যায়।

মহম্মদ সেলিম: রাজনৈতিক মঞ্চে এ ধরনের অভিনয় হতেই থাকে, শত্রু–মিত্র গুলিয়ে যায়। এমনটা বলছি না যে তৃণমূল এবং আরএসএস একই সংগঠন। তা নয়। এখন এখানে আমরা কীভাবে পৌঁছালাম, তার তো একটা ইতিহাস আছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল গঠিত হওয়ার পর তারা বিজেপির সঙ্গে মিলে নির্বাচনে লড়েছে। আমরা তো লড়িনি।

এরপর ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে রাতারাতি তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের আঁতাত হলো। বিজেপি তখন পরাজিত। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস তখন তৃণমূলের প্রস্তাব গ্রহণ করল। আরএসএসের পরিকল্পনায় বিজেপির গোটা ভোট চলে গেল তৃণমূল জোটে। তাদের সম্মিলিত লক্ষ্য ছিল বাম ফ্রন্টকে সরানো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাওবাদী, কিছু বামপন্থী দল এবং প্রচারমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে একটা বিকল্প ভাবমূর্তি গড়লেন। মুসলমানদের কাছেও ভাবমূর্তি তৈরির জন্যে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়ত উলেমায়ে হিন্দ, মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনকে কাছে টানলেন। তিনি বিজেপিবিরোধী শক্তি, এটা বোঝালেন। আমাদের সমর্থক-দরদি একটা অংশও মনে করেছিল, বাম ফ্রন্টের তিন দশক তো হলো, নতুন কিছু হোক। নতুন কিছু পশ্চিমবঙ্গে হয়নি।

গত ভোটে বিজেপিকে আটকানোর জন্য অনেকে ভোট দিয়েছেন। ভোটারের দোষ কোথায়?

মহম্মদ সেলিম: আমরা দোষ দিচ্ছি না। এটা সবকিছু মিলিয়ে হয়েছে। একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। নাগরিত্ব আইন (সিএএ), নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) একদিকে চলেছে; অন্যদিকে দিলীপ ঘোষ (২০২১ সালে বিজেপির রাজ্য সভাপতি) বললেন, দুই কোটি বাঙালিকে বাংলাছাড়া করে দেব। নরেন্দ্র মোদি বললেন, পোশাক দেখলে চেনা যায়। অমিত শাহসহ সবাই পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে আসতে শুরু করলেন। আর মমতা নাড্ডা-গাড্ডা (বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা) বলে ভোটের মাঠ গরম করলেন। ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা দুর্নীতির ইস্যু পেছনে চলে গেল। মেরুকরণটা এত স্বাভাবিক হলো, সাধারণ ভোটার তো বটেই, মজে যাওয়া বিপ্লবী বামপন্থী দলগুলোও ধরতে পারল না। লড়াইটা পরিণত হলো তৃণমূল বনাম বিজেপিতে।

এটা বোঝা দরকার, পশ্চিমবঙ্গে সামনে তৃণমূল থাকলেও পেছন থেকে খেলছে বিজেপি। বস্তুত, ভারতে এখন তিন ধরনের দল আছে, যারা শরিক। বিজেপির সম্ভাব্য শরিক, (বিজেপি) ছেড়ে আসা দল এবং বর্তমান শরিক। তিনটিতেই তৃণমূলের নাম নেওয়া যেতে পারে।

আপনারা সম্প্রতি একটি বিধানসভা উপনির্বাচনসহ কিছু নির্বাচনে বিজেপিকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছেন। আপনি যে মেরুকরণের রাজনীতির কথা বলছেন, সেটা সিপিআইএম ভাঙতে পারবে?

মহম্মদ সেলিম: সেই চেষ্টা চলছে। কিছুদিন আগেই একটা গরম পরিস্থিতি তৈরি হলো, নূপুর শর্মা (বিজেপি নেত্রী) মহানবী (সা.)–কে নিয়ে কটূক্তি করলেন, বিজেপি উসকানি দিল। তৃণমূল লোকদেখানো প্রতিবাদ করল। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আমরা আমাদের মতো করে পথে নামলাম, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করলাম এবং যে কারণেই হোক এটা পশ্চিমবঙ্গে ছড়াল না।

এখানে বলা প্রয়োজন, ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত যখন বামপন্থীরা শূন্য হলো, তখন দাঙ্গার মানচিত্র আর ভোটের ফলাফলের মানচিত্রে দেখা যাবে যেখানে সিপিআইএমের শক্তি ছিল, সেখানে সাম্প্রদায়িক সংঘাত হলো। বামদের ভোট অনেক কমে গেল। আমরা এই বাইনারিটা (মেরুকরণের রাজনীতি) ভাঙার চেষ্টা করলাম।

পশ্চিমবঙ্গে এই যে হিন্দু-মুসলমান ব্যাপারটা তৈরি হলো, এটা কীভাবে হলো? আমি একটা কথা বললেই প্রশ্ন ওঠে, এ বাংলাদেশি কি না। ফয়েজ বা ইকবালের কবিতা উদ্ধৃত করলে বলা হয়, বাঙালি হয়ে কেন উর্দু বলছেন। এ কথা বাংলাদেশে বলছে না, পশ্চিমবঙ্গে বলছে। পশ্চিমবঙ্গের আলাদা অবস্থান ছিল। বাংলা ভাষার নামে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে একটা দেশ তৈরি হলো। সত্তরের পরে বাঙালির নতুন চেতনা তৈরি হলো, অখণ্ড বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে উঠল। অথচ আজকে দেখছি, ভাষার নামে, ধর্মের নামে মানুষকে পৃথক করা হচ্ছে। এটা এ রাজ্যে তৃণমূলের অবদান। এর সঙ্গে দুর্নীতির বিষয়টা আছে, যেটা বারবার তুলে ধরেছি। এটা বিজেপিও বলছে ঠিকই, কিন্তু বিজেপিও এটার সঙ্গে মিলেমিশে আছে।

জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নে, জাতীয় স্তরে কোনো জোট হওয়ার সম্ভাবনা দেখাই যাচ্ছে না।

মহম্মদ সেলিম: না, এখন সেটা দেখা যাচ্ছে না এবং যাবেও না। একেক রাজ্যে ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা। আমরা বলেছি, রাজ্যস্তরে, যে যেখানে বিজেপিবিরোধী দল নিয়ে শক্তিশালী, তাদের সেখানে এগোতে হবে। এটা বিভিন্ন রাজ্যে শুরু হয়েছে এবং যখনই তা শুরু হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কারণ, মমতার রাজনীতি বিজেপিবিরোধী জোটকে এক জায়গায় আনা নয়। তাঁর লক্ষ্য, জাতীয় স্তরে বিজেপির সুবিধা করে দেওয়া।

এই জোটে যদি মমতা ঢোকেন, তাহলে বামপন্থীদের ভূমিকা কী হবে?

মহম্মদ সেলিম: ঢুকবেন না। তাঁকে তো নাগপুরে আরএসএসের সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ নিয়ে জোটে ঢুকতে হবে। আর তা না হলে তাঁর মৌলিক রাজনীতি গন্ডগোল হয়ে যাবে।

ভারতে মুসলমানদের ওপর সীমাহীন আক্রমণ নেমে আসছে। তাদের রাজনৈতিক পরিসর ক্রমে কমছে। আপনার মনে হয় যে এটা নিয়ে সিপিআইএমের যতটা সরব হওয়া দরকার, তা তারা এখনো হয়নি?

মহম্মদ সেলিম: আমি মানছি না। ছাত্রনেতা উমর খালিদের জেলে থাকার দুই বছর হলো, সিপিআইএম ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক দল এটা নিয়ে মাঠে নেমে কথা বলেছে? জম্মু-কাশ্মীরে সংবিধানের ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়া হলো। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তিনি জানেন না কী হয়েছে। শুধু তিনি নন, অন্য রাজনৈতিক দল কোনো অবস্থান নেয়নি, সিপিআইএম ছাড়া। কংগ্রেসও নেয়নি। তৃতীয়ত, দিল্লির শাহীনবাগে আক্রমণ বা উত্তর প্রদেশে (মুসলমানদের বিরুদ্ধে) বুলডোজার পলিটিকস যখন শুরু হলো, তখন কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া আর কোনো দল এসব নিয়ে বলেছে?

পিএফআইয়ের (মূলত মুসলিমপ্রধান দল পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়া) এত লোককে গ্রেপ্তার করা হলো, সেটা নিয়ে কিছু বলা হয়নি…

মহম্মদ সেলিম: আমরা পিএফআইয়ের বিরুদ্ধে শুরু থেকে লড়ছি। এটি শুধু মৌলবাদী নয়, উগ্রপন্থী একটি সংগঠন। আমরা সব ধরনের মৌলবাদের বিরোধিতা করেছি এবং করব। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছি, কেন তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ আইন ব্যবহার না করে সন্ত্রাস দমন আইন ব্যবহার করা হলো।

আমরা শেষ করব। আগামী বছরে আপনার প্রধান তিনটি লক্ষ্য কী হবে?

মহম্মদ সেলিম: প্রথম হচ্ছে গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচন। মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য যে পঞ্চায়েতব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। লুটেপুটে খাওয়া চলছে। পঞ্চায়েত নির্বাচন আগামী বছরের গোড়ায়। নির্বাচনটা ভালোভাবে করার চেষ্টা করব।

দ্বিতীয়ত, গোটা দেশকে বিজেপির হাত থেকে বাঁচাতে, কীভাবে একটা সার্বিক জোট করা যায়, তা দেখতে হবে।

তৃতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গে গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ জায়গাটা বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে ফিরে পেতে, সচেতন থেকে রাজনীতি করতে হবে। ‘সচেতন থেকে করতে হবে’ এ জন্য বললাম; কারণ, কাল যদি পশ্চিমবঙ্গে একটা বিস্ফোরণ হয়, তাহলেই দেখা যাবে মেরুকরণের রাজনীতি ফিরে আসছে। কীভাবে এটা হচ্ছে, তা সচেতনভাবে মানুষকে বোঝাতে হবে।