ভারতের অপেক্ষা দুটি ক্ষেত্রে। প্রথমটি অবশ্যই অর্থনৈতিক সংকট। জনগণকে কিছুটা সুরাহা দিতে দেশটি কী করে, সেদিকে ভারত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের মতে, মূল্যস্ফীতি দিন দিন বেড়ে চলেছে। ফলে জনতার ক্ষোভও বাড়ছে। দ্রুত এর সামাল দিতে না পারলে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। তেমন হলে অর্থনৈতিক সংকট অন্য ধরনের জাতিগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে।

দ্বিতীয় অপেক্ষা রাজনৈতিক। এই বিষয়ে ভারত আরও সতর্ক। সংকটের প্রথম দিকে দ্বীপরাষ্ট্রের কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এমন একটা ধারণা দিতে চেয়েছিল যে ক্ষমতাসীন রাজাপক্ষে পরিবারকে জনরোষ থেকে ভারত বাঁচাতে চাইছে। তাদের দেশত্যাগে মদদ দিচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রটির কথায়, দ্রুত ওই ধারণা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে। সে দেশের হাইকমিশন থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, এ-সংক্রান্ত প্রচার একেবারেই মনগড়া, ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর। স্পষ্ট করে ভারত তখন থেকেই জানিয়ে আসছে, সরকার নয়, ভারত দৃঢ়ভাবে রয়েছে শ্রীলঙ্কার জনগণের সঙ্গে। গণতন্ত্রের সঙ্গে। ভারতের অবস্থান সে দেশের সংবিধানের পক্ষে। শ্রীলঙ্কার সমৃদ্ধি ও উন্নতিই ভারতের কাম্য।

বিদায়ী সরকার অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষই যে ভারত নিচ্ছে না, বারবার সে কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে ওই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চরিত্র কী হতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা ভারতীয় নেতৃত্বের এখনো নেই। পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে থাকার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, বিপদের সময় প্রতিবেশীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে ভারত বদ্ধপরিকর। এ-ও বোঝাচ্ছে, পরিবর্তন যা-ই হোক, তা যেন গণতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণভাবে হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ওই দেশে সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ডামাডোল শুরু হওয়ার সময় উদ্বাস্তু-সংক্রান্ত একটা শঙ্কা ভারতের মনে উঁকি দিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি সেই আশঙ্কা থেকেও ভারত মুক্ত।

ভারতের ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের (আইডিএসএ) গবেষক স্মৃতি পট্টনায়ক গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, এটা ঠিক যে শ্রীলঙ্কার নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের স্বার্থ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। দুই দেশের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আত্মিক যোগ যেমন অনন্তকালের, তেমনই আধুনিক পৃথিবীতে ভূকৌশলগত যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে দ্বীপরাষ্ট্র নিয়ে ভারত কখনো উদাসীন থাকেনি। থাকতে পারেও না। তবে এই মুহূর্তে সবকিছু ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে আর্থিক সংকট। স্মৃতি বলেন, ২০ জুলাই শ্রীলঙ্কার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রনিল বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হবেন জানিয়েছেন। যিনিই নির্বাচিত হোন, তাঁর প্রথম কাজ হবে আর্থিক সংকট থেকে দেশকে বের করে আনা। বাকি সব পরের কথা।

এই সংকট চীনের পক্ষে আদৌ সুখকর নয়। কারণ, তাদের পাতা ঋণের ফাঁদে পড়ায় চীনা সম্প্রসারণবাদ সম্পর্কে দ্বীপরাষ্ট্রের জনগণের মনে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়েছে। এই পরিস্থিতি ভারতের পক্ষে কিছুটা স্বস্তিজনক বলে সাউথ ব্লক মনে করছে। এই মনোভাব আগামী দিনে ভারত কীভাবে কাজে লাগাবে, সেটা পরের কথা। আপাতত ভারত তাকিয়ে রয়েছে নতুন সরকার ঋণের মোকাবিলা কীভাবে করে। শ্রীলঙ্কা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এস ডি মুনি এই প্রসঙ্গে শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, রনিল বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট হলে ভারত খুশি হবে। ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বহুদিনের। কিন্তু তাঁকে অর্থনৈতিক সংস্কার ও জনগণের সুরাহার মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। সেটা তিনি কতটা পারবেন, বলা কঠিন। অধ্যাপক মুনি আরও বলেন, শ্রীলঙ্কার এই আন্দোলন কোনো দলনির্ভর নয়, স্বতঃস্ফূর্ত। কাজেই রনিলকে জনতা আদৌ সমর্থন করবে কি না, করলে কত দিন, সেটাও দেখার। শেষ কথা বলা তো দূরের কথা, এক-দুই মাস পরের অবস্থা কেমন হতে পারে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী করাও এই মুহূর্তে কঠিন। তাঁর মতে, ভারতের অপেক্ষা ছাড়া করণীয় আর কিছুই নেই।

ভারত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন