‘আমি নিরাপদেই বাড়ি ফিরব,’ মার্কিন হামলায় নিহত ভারতীয় নাবিকের স্ত্রীকে বলা শেষ কথা
‘ও আমাকে বলেছিল, শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। আমি কখনো ভাবিনি ও এভাবে ফিরবে।’ কথাগুলো বলছিলেন পাটনালা ভার্গবী। চলতি সপ্তাহে ওমান উপসাগরের কাছে মার্কিন হামলায় নিহত হয়েছেন তাঁর স্বামী ভারতীয় নাবিক পাটনালা সুরেশ।
ভারতীয় এই দম্পতি এ মাসেই তাঁদের ১৫তম বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রহর গুনছিলেন। কিন্তু এর বদলে ভার্গবী এখন তাঁকে ছাড়া ভবিষ্যৎ মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
গত বুধবার ওমান উপসাগরে তেলের ট্যাংকার এম টি সেত্তেবেলোতে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওই হামলায় নিহত তিন ভারতীয় নাবিকের একজন ছিলেন সুরেশ।
ইরানসংশ্লিষ্ট পণ্য পরিবহনের ওপর ওয়াশিংটনের অবরোধ বাস্তবায়নচেষ্টার অংশ হিসেবে ওই হামলা চালানো হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, বারবার সতর্ক করার পরও ট্যাংকারটি তা শোনেনি এবং এটিতে করে ইরানের তেল নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
তবে জাহাজটির ব্যবস্থাপকেরা এই দাবি অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, ইরানের সঙ্গে জাহাজটির কোনো সম্পর্ক ছিল না। আর হামলার আগে তাঁরা কোনো সতর্কবার্তা পাননি। এ ঘটনায় জাহাজের অপর ২১ কর্মীকে উদ্ধার করা হয়।
এই মৃত্যুর ঘটনায় ভারতজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অন্ধ্র প্রদেশের উপকূলীয় শহর বিশাখাপত্তনমে ভার্গবীর বাড়ি থেকে শুরু করে শত শত কিলোমিটার দূরের গ্রাম–শহরের অন্য পরিবারগুলোও শোক পালন করছে। জীবিকার তাগিদে এই নাবিকেরা সাগরে গিয়েছিলেন।
শোকের পাশাপাশি অনেকেই এই হামলার পেছনের কারণ জানতে চাইছেন। সেই সঙ্গে নাবিকদের লাশ কবে দেশে ফিরবে, সেই অপেক্ষায় আছেন তাঁরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া এক পোস্টে ভারতের নৌপরিবহনমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল জানিয়েছেন, নাবিকদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তিন নাবিকের মৃত্যুকে তিনি ভারতের সামুদ্রিক পেশাজীবী সমাজের জন্য এক ‘অপূরণীয় ক্ষতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এই হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটনের কাছে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত। একজন শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে তলব করে উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
তবে এসব বড় বড় ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে ভার্গবীর কোনো মাথাব্যথা নেই।
সুরেশের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকে তাঁদের বাড়িতে মানুষের ভিড় লেগেই আছে।
সমবেদনার মধ্যেই ভার্গবীর বারবার মনে পড়ছে তাঁদের শেষ কথোপকথন। তাঁর মনে পড়ে, তিনি (তাঁর স্বামী সুরেশ) বলেছিলেন, ‘এই এলাকায় হামলা হচ্ছে এবং বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে। কিন্তু আমাকে নিয়ে ভেবো না। আমি নিরাপদে বাড়ি ফিরব এবং আমরা সুন্দরভাবে বিবাহবার্ষিকী উদ্যাপন করব।’
সুরেশ আর দুই সন্তানের ছবি নিয়ে বসে থাকা ৩৯ বছর বয়সী ভার্গবী এখন স্বামীর মৃত্যুর এই নিঠুর বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সুরেশ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় ১৫ বছর সাগরে কাটিয়েছেন তিনি। এ কাজের সুবাদে তিনি সারা বিশ্ব ঘুরেছেন।
জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে বছরে ছয় মাসের ছুটি পেতেন সুরেশ। কিন্তু তিনি এই ছুটির খুব কমই কাটাতেন বলে জানান তাঁর বাবা রামকৃষ্ণ। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘সে নিজের কাজকে খুব ভালোবাসত। বেশির ভাগ সময় সাগরে কাটাতেই পছন্দ করত।’
দিনের পর দিন তাঁর বাড়ির বাইরে থাকার বিষয়টা পরিবারের সদস্যরা অনেক আগেই মেনে নিয়েছিলেন।
কয়েক দিন পরপরই স্বামী-স্ত্রী ভিডিও কলে কথা বলতেন। মাঝেমধ্যে জাহাজের অন্য কর্মীরাও যোগ দিয়ে কুশল বিনিময় করতেন। কিন্তু ৫ জুন থেকে ফোনে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৯ জুনের পর কথা বলা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
ভার্গবী বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম সাগরে থাকার কারণে হয়তো নেটওয়ার্কের সমস্যা হচ্ছে।’ দুই দিন খবরের অপেক্ষায় থাকার পর তিনি জানতে পারেন, হামলায় তাঁর স্বামী নিহত হয়েছেন।
প্রথমে পরিবারটি আশা করেছিল, কোথাও কোনো ভুল হয়েছে এবং সুরেশকে হয়তো জীবিত পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই আশা দ্রুতই বিবর্ণ হয়ে যায়।
বৃহস্পতিবার ভার্গবী জানান, জাহাজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের পরিবারকে বলেছে, যখন হামলা হয়, তখন পালানোর কোনো সুযোগই ছিল না। তিনি বলেন, সে সময় সুরেশ জাহাজের একটি জেনারেটরের ত্রুটি পরীক্ষা করছিলেন।
পরিবারটি এখন তাঁর মরদেহ ভারতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে এবং সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করছে। তারা জানিয়েছে, তিনিই (সুরেশ) ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
সুরেশের দুই ছেলে রয়েছে। সেই সঙ্গে ভার্গবীর বড় বোন ও ভগ্নিপতির মৃত্যুর পর তাঁদের দুই মেয়েকে তাঁরা লালন–পালন করছিলেন।
ভার্গবী বলেন, ‘পুরো পরিবার ওর আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন আমি বুঝতে পারছি না, কীভাবে সন্তানদের বড় করব বা পড়াশোনা করাব।’
এই হামলায় নিহত অপর দুই নাবিকের পরিবারেও এখন একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
ভারতের উত্তরাঞ্চলের রাজ্য হিমাচল প্রদেশের হামিরপুর জেলার ২৩ বছর বয়সী আদিত্য শর্মার পরিবার তাঁদের একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকে মুষড়ে পড়েছে।
আদিত্যর বাবা রাজেশ শর্মা বিবিসি হিন্দিকে বলেন, ‘আমি চাই, আমার ছেলের লাশ আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। শেষ মুহূর্তে ওর সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেটাও আমাদের জানানো উচিত।’
জাহাজের কর্মীদের বাঁচাতে যথেষ্ট কিছু করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাজেশ শর্মা। তিনি বলেন, ‘অন্যদের যদি উদ্ধার করা যায়, তবে এই তিনজনকে কেন বাঁচানো গেল না?’
সেখান থেকে এক হাজার কিলোমিটার (৬২১ মাইল) দূরের উত্তর প্রদেশের দেওরিয়া জেলার ৩৫ বছর বয়সী শিবানন্দ চৌরাসিয়ার পরিবারও একই রকম শোকে ভাসছে।
পেশায় ফিটার শিবানন্দ চৌরাসিয়া বিদেশি একটি জাহাজ কোম্পানিতে কাজ করতে প্রায় আট মাস আগে বাড়ি ছেড়েছিলেন। তাঁর বাবা রামজি চৌরাসিয়া সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘গত পরশু রাতে ওর সঙ্গে আমাদের কথা হয়। ও বলেছিল সবকিছু ঠিক আছে। আর এখন আমাদের জানানো হলো, ও আর বেঁচে নেই।’
বিশাখাপত্তনমের ভার্গবীর মতো এই দুই পরিবারও প্রিয়জনের লাশ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
যেসব ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ট্যাংকারটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে, সেসব এই পরিবারগুলোর সদস্যদের কাছে অনেক দূরের বিষয়। তাঁরা বলছেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—তাঁদের ছেলে ও স্বামীকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পাওয়া।