কে এই ধ্রুব রাঠি, কীভাবে হয়ে উঠলেন এত জনপ্রিয়

জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে আলোচনায় বহুল পরিচিত ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। এ কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।

কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ধ্রুব রাঠি ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্বচ্ছতার সম্পূর্ণ অভাব রয়েছে। ইসির কোনো জবাবদিহিও নেই।

তবে ধ্রুব রাঠি এ কথাও বলেন, ‘আমি এখানে সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে আসিনি।’ তিনি এ কথা বললেও সিজেপির আন্দোলনে ধ্রুব রাঠির সশরীর অংশগ্রহণ ভারতের মোদি সরকারের জন্য বড় ধরনের চিন্তার বিষয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, কে এই ধ্রুব রাঠি?

জন্ম, বেড়ে ওঠা, শিক্ষা

ধ্রুব রাঠির জন্ম ১৯৯৪ সালে
ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে

ধ্রুব রাঠির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, তাঁর জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের রোহতকের একটি হিন্দু জাট পরিবারে।

বাবা মহাবীর রাঠি, মা ঊর্মিলা রাঠি। ওয়েবসাইটে বলা হয়, একটি আন্তরিক পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় মা–বাবা ধ্রুব রাঠির মধ্যে কঠোর পরিশ্রম, শ্রদ্ধাবোধ ও জানার আগ্রহের মতো মূল্যবোধগুলো গড়ে তুলেছিলেন। একটি সুশিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমসাময়িক ঘটনাবলির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ভালোবাসা ও শেখার আনন্দে ভরা হরিয়ানায় কাটানো শৈশব তাঁর পরবর্তী জীবনে শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছে। হরিয়ানায় বেড়ে ওঠা তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে শিক্ষাজীবন—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর আজকের অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে হরিয়ানায় কাটানো শৈশবের বড় অবদান রয়েছে।

দেশের সীমানা পেরিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করার আগে ধ্রুব রাঠি হরিয়ানায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে জার্মানিতে পাড়ি জমান। তিনি জার্মানির স্বনামধন্য কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (কেআইটি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা শুরু করেন।

আরও পড়ুন
ধ্রুব রাঠি ১৭ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে জার্মানিতে পাড়ি জমান
ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে

ভারত থেকে জার্মানিতে পাড়ি জমানোর এই পরিবর্তন ধ্রুব রাঠির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে একই সঙ্গে তা ছিল অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই শিক্ষাজীবন ও কনটেন্ট তৈরির জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়।

স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর ধ্রুব রাঠি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে পরবর্তী উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বব্যাপী ক্ষেত্রটির গুরুত্ব তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি কেআইটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি সমাধান সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতা আরও সুদৃঢ় হয়।

ওয়েবসাইটে বলা হয়, এই শিক্ষাজীবন ধ্রুব রাঠিকে শুধু প্রকৌশলের ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানই দেয়নি, বরং নিজের ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার সুযোগও তৈরি করে দিয়েছে।

ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, ‘বর্তমানে আমি জার্মানিতে বসবাস করলেও ভারত সব সময়ই আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি দেশ হয়ে থাকবে। আমি নিয়মিত ভারতে যাতায়াত করি। আমার কনটেন্টের মাধ্যমে দেশটির অগ্রগতি ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি।’

ইউটিউবে যাত্রা

ইউটিউবের জগতে ধ্রুব রাঠির পথচলা শুরু হয় ২০১৩ সালে
ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে

ধ্রুব রাঠির ইউটিউব চ্যানেল শুরু করার পেছনে আগে থেকে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জ্ঞান ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও ভালোবাসা থেকেই এর সূচনা হয়েছিল। তিনি লিখেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্ল্যাটফর্ম তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, যা তাঁকে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গভীর বিশ্লেষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ কনটেন্টের জন্য পরিচিত তাঁর এই চ্যানেল এখন এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষার সঙ্গে বিনোদনের মেলবন্ধন ঘটেছে।

ইউটিউবের জগতে ধ্রুব রাঠির পথচলা শুরু হয় ২০১৩ সালে, জার্মানিতে কলেজজীবনে থাকাকালে। ওয়েবসাইটে বলা হয়, শুরুতে তাঁর চ্যানেলটি ছিল নিছক শখের একটি মাধ্যম, যেখানে তিনি প্রযুক্তি ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা–জ্ঞান ভাগাভাগি করে নিতেন। এসব বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহের পেছনে ছিল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশল নিয়ে তাঁর পড়াশোনা।

২০১৪ সালে ধ্রুব রাঠির কোনো ভিডিও প্রথমবারের মতো ভাইরাল হয়
ছবি: ধ্রুব রাঠির ওয়েবসাইট থেকে

ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, ‘২০১৪ সালে আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জগতে নিজের অবস্থান খুঁজে পাই। আমার প্রথম ভাইরাল ভিডিওটি ছিল সেই যাত্রার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। ভিডিওটিতে ভারতে বিজেপি সরকারের কার্যক্রম ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এটি ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা নানা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয় এবং ইউটিউবার হিসেবে আমাকে পরিচিতি এনে দেয়।’

বছরের পর বছর ধরে ধ্রুব রাঠির ভিডিওগুলোয় সামাজিক সমস্যা থেকে শুরু করে ইতিহাস, রাজনীতি, বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসতে শুরু করে। তিনি লিখেছেন, ‘এই দীর্ঘ পথচলায় আমার লক্ষ্য সব সময় একই থেকেছে—দর্শকদের সামনে পক্ষপাতহীন ও তথ্যনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা।’

ধ্রুব রাঠি উল্লেখ করেন, ওয়েবসাইটে নিজের জীবনী লিখতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, ইউটিউব কীভাবে নিছক একটি প্ল্যাটফর্মের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে মানুষের কাছে জটিল বিষয়গুলো সহজবোধ্য করে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

মাইলফলক

ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, তাঁর ইউটিউব ক্যারিয়ারে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত এসেছে, যেগুলো শুধু তাঁর চ্যানেলের পথচলাকেই নয়, বরং একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তাঁর পরিচয়কেও গড়ে তুলেছে।

ধ্রুব রাঠির ক্যারিয়ারের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক তুলে ধরা হলো—

২০১৩ সালে ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন ধ্রুব রাঠি। প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি শুরুতে প্রযুক্তি ও পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করতেন।

২০১৪ সালে ধ্রুব রাঠির কোনো ভিডিও প্রথমবারের মতো ভাইরাল হয়। বিজেপি সরকারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে তিনি এই ভিডিও তৈরি করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণমূলক কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।

বেঙ্গালুরুর সমাবেশের মঞ্চে ধ্রুব রাঠি (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)
ছবি: এএফপি

২০১৮ সালে দ্বিতীয় ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন ধ্রুব রাঠি। ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য ‘ধ্রুব রাঠি ভ্লগস’ নামের দ্বিতীয় চ্যানেলটি চালু করেন তিনি।

২০২২ সালে ধ্রুব রাঠির বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রাইবার ও অনুসারীর সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করে। এটি ছিল তাঁর কাজের প্রভাব ও জনপ্রিয়তার প্রতিফলন। বিষয়টি তাঁকে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ইউটিউবার হিসেবে পরিচিতি পেতে সহায়তা করে।

২০২৩ সালে ‘ধ্রুব রাঠি একাডেমি’ চালু হয়। নাস একাডেমির সঙ্গে যৌথভাবে এটি চালু করেন ধ্রুব রাঠি। এখানে তিনি প্রথম সময় ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কোর্স নিয়ে আসেন।

ফলোয়ার–সাবস্ক্রাইবার

ইউটিউব (@DhruvRathee): এই চ্যানেলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩ কোটি ৩০ লাখ।

ইউটিউব (@DhruvRatheeVlogs): এটি ভ্রমণবিষয়ক ভ্লগ। সাবস্ক্রাইবারের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩০ হাজার।

ইনস্টাগ্রাম (@dhruvrathee): ধ্রুব রাঠির ইনস্টাগ্রামে ফলোয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৯১ লাখ।

ফেসবুক (@DhruvRathee): ধ্রুব রাঠির ফেসবুকে ফলোয়ার সংখ্যা ৭৬ লাখ।

এক্স (@dhruv_rathee): এক্সে ফলোয়ারের সংখ্যা ৩৩ লাখ।

ওয়েবসাইটে ধ্রুব রাঠি লিখেছেন, এই মাইলফলকগুলো শুধু একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তাঁর বিকাশের গল্পই তুলে ধরে না, বরং কর্মজীবনের নানা পর্যায়ের পরিবর্তনকেও ফুটিয়ে তোলে। গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্ত দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া পর্যন্ত এই পুরো যাত্রা তাঁর জীবনে সত্যিই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।

আরও পড়ুন