ভারতে এখন থেকে আমিষ–নিরামিষ রঙের ফোঁটা ভোগ্যপণ্যেও
এবার থেকে আর শুধু খাদ্যদ্রব্যই নয়, কোনটা আমিষ আর কোনটা নিরামিষ, তা চিহ্নিত করতে হবে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যেও। নিত্যব্যবহার্য যাবতীয় পণ্য, দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষ যা ব্যবহার করে, তা আমিষ না নিরামিষ, বিশেষ রং দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা সংশোধন করে এই চিহ্নিতকরণ বাধ্যতামূলক করেছে।
এ সংশোধনীর ফলে এখন থেকে টুথপেস্ট, গায়ে মাখার সাবান, শ্যাম্পু, তেল বা বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনীর মোড়কে রঙের ফোঁটা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলো। লাল বা বাদামি রঙের ফোঁটা রাখার অর্থ ওই পণ্য তৈরিতে পশুর চর্বি বা কোনো আমিষ পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে। সবুজ ফোঁটার অর্থ পণ্যটি পুরোপুরি নিরামিষ। ভোক্তাকে যাতে অজান্তে আমিষ-নিরামিষ গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে না হয়, সে জন্যই এ ব্যবস্থা।
লিগ্যাল মেট্রোলজি (মোড়কজাত পণ্য) রুলস বা নিয়ম (২০১১) সংশোধনের মাধ্যমে ভারতের উপভোক্তা মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত সোমবার নিয়ম সংশোধনের পর তার গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি হয়। সংশোধিত বিধি অনুযায়ী, পণ্যের মোড়কে এমন জায়গায় লাল বা বাদামি কিংবা সবুজ রঙের ওই ফোঁটা রাখতে হবে, যাতে ভোক্তা সহজেই তা দেখতে পান এবং সে অনুযায়ী কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, পণ্যের মোড়ক অথবা গায়ে এমন স্থানে এমনভাবে ওই ফোঁটা রাখতে হবে, যা কোনোভাবেই কারও নজর এড়াবে না।
কী কারণে এ পরিবর্তন, সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে সে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকেই এ নতুন নিয়ম সারা দেশে কার্যকর হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর নানাভাবে দেশকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার চেষ্টা চলছে। বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ইতিমধ্যে তা বলবৎ করা হয়েছে। কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের কাছে হিন্দু অর্থই নিরামিষাশী। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আমিষ-নিরামিষ দ্বন্দ্ব নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়েছে। দুর্গাপূজার মণ্ডপে আমিষ খাবার যাতে না থাকে, সে জন্য বিভিন্নজন বিভিন্ন মত দিয়েছেন। স্কুলে মিড–ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ইসকনকে। তারা শিশুদের ডিম দেবে না। ডিম সরবরাহ করবে অন্যরা। এ নিয়ে গোটা রাজ্যে বিতর্ক অব্যাহত।
এ বিতর্কের মধ্যেই খাদ্যাভাসের গণ্ডি পেরিয়ে আমিষ-নিরামিষ দ্বন্দ্ব ঢুকে পড়ল নিত্যব্যবহার্য পণ্যে। প্রকৃত নিরামিষাশী যাতে অজান্তে ‘আমিষ পণ্য’ ব্যবহার করতে না পারেন, সে লক্ষ্যেই এ নিয়ম বদল।
বহুদিন ধরে ভোক্তাদের একাংশের অভিযোগ ছিল, বহু সংস্থা কাউকে কিছু জানতে না দিয়ে নানান ভোগ্যপণ্যে পশুর চর্বি মেশায়। অথচ তা নিরামিষ বলে বিক্রি করে। নিরামিষাশী উপভোক্তা অজান্তে তা ব্যবহারও করেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লি হাইকোর্টে এ নিয়ে এক জনস্বার্থ মামলাও করা হয়।
অবশ্য ভারতে হিন্দু ও নিরামিষ সমার্থক নয়। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৭৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ হিন্দু। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ভারতের ৪৪ শতাংশ হিন্দু নিজেদের নিরামিষাশী বলে দাবি করেন। বাকি ৫৬ শতাংশ হিন্দু মাছ, মাংস, ডিম খান। ভারতের উত্তর, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে নিরামিষাশী হিন্দুর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭১ শতাংশ। পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দাক্ষিণাত্যে নিরামিষাশী হিন্দুর হার ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ।