পশ্চিমবঙ্গের ভোটে বিজেপির খরচ ২৮৭ কোটি রুপি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় এসেছে বিজেপিফাইল ছবি: রয়টার্স

চলতি বছর ভারতের পাঁচ রাজ্য-কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি তার তহবিল থেকে যত অর্থ ব্যয় করেছে, তার অর্ধেকই হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।

প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে বিজেপি খরচ করেছে প্রায় ২৮৭ কোটি রুপি। ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে পাঠানো হিসাবে বিজেপি এই বিপুল খরচের তথ্য জানিয়েছে।

চলতি বছরের মাঝামাঝি পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি নির্বাচন হয় আসাম, তামিলনাড়ু, কেরলম ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পদুচেরিতে। এই পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপি তার দলীয় তহবিল থেকে খরচ করেছে মোট ৫২৯ কোটি ৩৮ লাখ রুপি। এর অর্ধেকের বেশি খরচ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে।

বিজেপি জানিয়েছে, এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরেও তাদের তহবিলে ৭ হাজার ৬৮৯ কোটি ৬ লাখ রুপি রয়েছে।

ভারতের ছয়টি জাতীয় রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আয়ের চেয়েও এই অর্থ বেশি। ইসিকে বিজেপি জানিয়েছে, এই পাঁচ রাজ্যে-কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচনকালে তারা ১ হাজার ৪৯৪ কোটি রুপি চাঁদা পেয়েছে।

কোন রাজ্যে কোন খাতে কত খরচ করা হয়েছে, সেই তথ্যও ইসির কাছে দাখিল করেছে বিজেপি। এতে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে সার্বিক নির্বাচনী প্রচারে তারা খরচ করেছে ২১৭ কোটি ১৬ লাখ রুপি। এ ছাড়া প্রার্থীদের জন্য খরচ করেছে ৬৯ কোটি ৮৩ লাখ রুপি। দল থেকে প্রার্থীদের যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তার পরিমাণ ৫৯ কোটি ৮০ লাখ রুপি। সব মিলিয়ে খরচ ২৮৬ কোটি ৯৯ লাখ রুপি।

বিজেপি আসামে খরচ করেছে ৯৬ কোটি ২৬ লাখ রুপি। কেরলম ৮২ কোটি ৬৭ লাখ, তামিলনাড়ুতে ৫১ কোটি ৫৬ লাখ ও পদুচেরিতে ১১ কোটি ৮৯ লাখ রুপি।

সব মিলিয়ে পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির খরচ ৫২৯ কোটি ৩৮ লাখ রুপি।

ভারতে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের খরচের বহরের ঊর্ধ্বসীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রণ নেই। এ ক্ষেত্রে কোনো ঊর্ধ্বসীমা ইসি বেঁধে দেয়নি। তবে প্রতিটি নির্বাচনের পর দলকে ইসির কাছে খরচের সবিস্তার হিসাব দাখিল করতে হয়।

১২ বছর আগে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির দলীয় তহবিল ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করে। নির্বাচনী ব্যয় স্বচ্ছ করা ও রাজনীতিতে কালোটাকার জোগান বন্ধের যুক্তিতে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ‘ইলেকশন বন্ড বা নির্বাচনী বন্ড’ প্রথা চালু করেছিল। ২০১৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে এই প্রথা ঘোষণা করা হয়। পরের বছর, ২০১৮ সাল থেকে তা চালু হয়ে যায়।

এই প্রথা অনুযায়ী দেশের যেকোনো নাগরিক বা কোম্পানি রাষ্ট্রায়ত্ত স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া থেকে ১ হাজার, ১০ হাজার, ১ লাখ, ১০ লাখ ও ১ কোটি রুপি মূল্যের ইলেকশন বন্ড কিনতে পারত। সেই বন্ড সেই ব্যক্তি বা সংস্থাকে তার পছন্দের রাজনৈতিক দলের ব্যাংক হিসাবে জমা দিতে হত। সংশ্লিষ্ট দল ১৫ দিনের মধ্যে সেই বন্ড ভাঙিয়ে সমপরিমাণ রুপি তহবিলে ভরতে পারত। বন্ডের গায়ে ক্রেতার নাম লেখা থাকত না। রাজনৈতিক দলকে কোন ব্যক্তি বা সংস্থা কত চাঁদা দিচ্ছে, সেই তথ্য শুধু ব্যাংক কর্তৃপক্ষের জানার অধিকার ছিল। সাধারণ জনতা বা নির্বাচন কমিশনেরও সেই তথ্য জানার অধিকার ছিল না।

এই গোপনীয়তার সুযোগে সরকারে আসীন বিজেপির মাত্রাতিরিক্ত লাভবান হওয়ার অভিযোগ তোলে বিরোধীরা। এ নিয়ে মামলা হয়।

২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন ৫ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চ সর্বসম্মত রায়ে ইলেকশন বন্ড প্রথা বন্ধ করার নির্দেশ দেন।

সুপ্রিম কোর্টের যুক্তি ছিল, এই প্রথা তথ্য জানার অধিকার লঙ্ঘন করে।

গোপনীয়তার সুযোগে বিভিন্ন কোম্পানি বন্ড মারফত অর্থদানের বিনিময়ে সরকারি সুবিধা দেওয়া-নেওয়ারও অধিকারী হতো। সুপ্রিম কোর্টের মতে তা ছিল, ‘কুইড প্রো কো’। অর্থাৎ কিছু দেওয়ার বিনিময়ে কিছু নেওয়া।

তা ছাড়া এর মাধ্যমে ভুয়া বা লোকসানে চলা সংস্থা খুলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কালোটাকার সদ্ব্যবহারও করতে পারত। সুপ্রিম কোর্ট এই প্রথা ‘অসাংবিধানিক’ বলে তা খারিজের নির্দেশ দেন।

ইলেকশন বন্ড মারফত কোন দল কত টাকা পেয়েছে, তা একই বছরের ২৪ মার্চ নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দেয়। এতে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছে বিজেপি। বন্ড ভাঙিয়ে তাদের তহবিলে আসে ৬ হাজার ৯৮৬ কোটি ৫০ লাখ রুপি। দ্বিতীয় স্থানে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের আয় হয় ১ হাজার ৩৯৭ কোটি রুপি। তৃতীয় স্থানে কংগ্রেস। তারা পেয়েছিল ১ হাজার ৩৩৪ কোটি রুপি।

কেন্দ্র ও অধিকাংশ রাজ্যে ক্ষমতাসীন বিজেপির বার্ষিক আয় এখনো সবার চেয়ে বেশি। আয় বেশি বলে তারা খরচও বেশি করে।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের (এডিআর) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বিজেপি মোট ৩ হাজার ৭৭৪ কোটি ৫৮ লাখ রুপি খরচ করেছে। এই অর্থ তাদের দলীয় আয়ের ৫৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।