সিইসি জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন, হুঁশিয়ারি সিজেপির

দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অভিজিৎ দীপকেফাইল ছবি: এএফপি

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আগামী ২ অক্টোবর গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে আন্দোলন শুরু করবে। সেই আন্দোলন শুরু হবে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাই থেকে। তারপর দেশের বিভিন্ন শহরে তা ছড়িয়ে দেওয়া হবে। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে আজ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ কথা জানিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলন করে সিজেপির পক্ষ থেকে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ করতে বলা হয়। অভিযোগ তোলা হয়, সিইসি সবচেয় বড় দেশদ্রোহী। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক।

সিইসি জ্ঞানেশকে দেওয়া পদত্যাগের ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হবে আগামীকাল শনিবার। অভিজিৎ দিপকে আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেন। তাতে লেখেন, শনিবারের (আগামীকাল) মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর থেকে শুরু হবে আন্দোলন। তিনি আরও লেখেন, ‘গান্ধীজয়ন্তীতে গণতন্ত্র রক্ষার শপথ নিন।’

ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নির্বাচন কমিশনের অন্তর্কলহের খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে গোটা দেশে সাড়া পড়ে গেছে। বিরোধীরা একযোগে সিইসির পদত্যাগ দাবি করেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সিইসি ভোট চুরি চালিয়ে যাচ্ছেন শাসক বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা পাইয়ে দিতে। বিরোধীরা একযোগে এই দাবিও জানিয়েছে, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন শুরু করেছে, তা অবিলম্বে বাতিল করা হোক। পুরোনো তালিকা অনুযায়ী ভোট করা হোক। এসআইআর করে যে রাজ্যগুলোয় ভোট হয়েছে, তা বাতিলের দাবিও জানানো হয়।

ককরোচ জনতা পার্টি এর আগে দেশের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও চাকরির পরীক্ষার লাগামছাড়া দুর্নীতির প্রতিবাদে গত জুন মাসে দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি যে আন্দোলন শুরু করে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়। এবার সিইসির বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনারের মারাত্মক অভিযোগের পর সিজেপি নেতৃত্ব ‘দ্বিতীয় যন্তর মন্তর’–এর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

অভিজিৎ দিপকে আজ বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশেও এক বার্তা দেন। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ভোট চুরির অভিযোগ এনেও বিরোধী দলগুলো কেন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, সেই প্রশ্ন তোলেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ভোট চুরি ও জালিয়াতির অভিযোগ তোলা এবং ভোটে অংশ নেওয়া পরস্পরবিরোধী আচরণ। তিনি মনে করেন, বিরোধীদের এই দ্বিচারিতার দরুন কারচুপির নির্বাচন রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে। দেশের ভোটের প্রক্রিয়া যে অবাধ ও নিরপেক্ষ, সেই ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে গেঁথে যাচ্ছে। দিপকের ভাষায়, ‘আপনি বারবার বলবেন খেলায় চুরি হচ্ছে, ম্যাচ ফিক্সড; অথচ সেই খেলায় অংশও নেবেন, এটা হয় না। এতে কারচুপির নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়। একে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা বলে না। এই ব্যবস্থা আপনাদের দুর্বল করছে। যখন–তখন দল ভেঙে দিচ্ছে।’

বর্তমানের নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দিপকে একটা ‘ফিক্সড’ ক্রিকেট ম্যাচের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফিক্সড ম্যাচকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখানো হয়। দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে ক্যাচ ফসকানো হয়। শেষ ওভার পর্যন্ত খেলাটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার নাটক করা হয়। জালিয়াতির নির্বাচনকেও তেমন বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিরোধীদের কোথাও কোথাও জেতানো হয়। মেকি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আসল ও নিরপেক্ষ দেখানোর চেষ্টা চালানো হয়। এ ক্ষেত্রে তেমনই হচ্ছে। সিজেপি নেতা বিরোধীদের পরোক্ষে ভোট বয়কটের পরামর্শ দিয়েছেন। বিরোধীদের প্রতি তাঁর প্রশ্ন, যখন ভোট চুরি হচ্ছে, সংসদ সদস্য-বিধায়কদের ভাঙিয়ে নেওয়া হচ্ছে, দল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে, তখন কোন ধরনের অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছেন? এভাবে কত দিন টিকে থাকা সম্ভব? বিরোধী অনৈক্যের প্রতিও তিনি ইঙ্গিত করেছেন। দিপকে বলেছেন, ‘কেবল আপনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এমন রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে সরব হবেন আর অন্যত্র নীরব থাকবেন, এমন হতে পারে না। ভোটে কারচুপি হলে তা যেকোনো রাজ্যে হতে পারে।’

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীরা খড়্গহস্ত হলেও শাসক দল বিজেপি শুরু থেকেই ইসির পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বিজেপির বিভিন্ন নেতা কমিশনের হয়ে গতকাল থেকে সাফাই গাইছেন। এই পরিস্থিতিতে বেসুরো শুনিয়েছে বিহারে বিজেপির শরিক লোকজনশক্তি পার্টির নেতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী চিরাগ পাসোয়ানের বক্তব্য। আজ গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম সম্পর্কে দেশের মানুষের মনে যাতে বিরূপ ধারণা, সংশয় বা সন্দেহের সৃষ্টি না হয়, তা দেখার ও নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনেরই।

মন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন এক স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থা। এর বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকেই জনসমক্ষে দৃঢ়ভাবে নিজের ও কমিশনের অবস্থান জানাতে হবে। চিরাগ আরও বলেন, বিপক্ষ কী বলছে কীভাবে বলছে, সেটা বড় কথা নয়। তাদের কাজ রাজনীতি করা। তারা তা করবেই। অভিযোগ না করলে রাজনীতিটা তারা করবে কী করে? বিরোধীদের সন্তুষ্ট করা ইসির কাজ নয়; কিন্তু জনতাকে অবশ্যই সন্তুষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, রাহুল গান্ধী বা বিরোধীদের নয়, তারা যে নিরপেক্ষ সে কথা নির্বাচন কমিশনকে দৃঢ়ভাবে জনতাকে জানাতে হবে। জনতার মনে সন্দেহ, সংশয় থাকলে তার নিরসন করার দায়িত্ব মুখ্য নির্বাচন কমিশনারেরই।

বিরোধীদের মতো চিরাগ পাসোয়ান সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেননি ঠিকই; কিন্তু সরকারের শরিক হয়ে ইসির কাজকর্মের স্বচ্ছতা নিয়ে তাঁর এ মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ।