বাংলাদেশে সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের বার্তা নিয়ে গিয়েছি: জয়শঙ্কর
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছে। নির্বাচন নিয়ে আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আমরা আশা করি, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি থিতু হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ চেতনা বৃদ্ধি পাবে।’
জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের দুই ধরনের প্রতিবেশী আছে। ভালো ও মন্দ। বেশির ভাগ প্রতিবেশীই মনে করে, ভারতের প্রবৃদ্ধি ঘটলে তাদেরও প্রবৃদ্ধি হবে। ভারতের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তারাও উন্নত হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষশ্রদ্ধায় অংশ নিতে সে দেশে গিয়ে এই বার্তাই তিনি দিয়ে এসেছেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গত বুধবার ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। গত বছর গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এটাই ছিল ভারতের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির বাংলাদেশ সফর। সংক্ষিপ্ত সফরে খালেদা জিয়ার প্রতি শেষশ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দেন তিনি।
জয়শঙ্কর আজ শুক্রবার চেন্নাইয়ে আইআইটি মাদ্রাজে এক অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এ কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদল ও বিদ্যমান নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি কীভাবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার কথা ভাবা হচ্ছে।
প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জয়শঙ্কর প্রতিবেশীদের সম্পর্কে সাধারণভাবে দেশের মনোভাবের কথা তুলে ধরেন। তবে কোনো প্রতিবেশীরই নাম তিনি উল্লেখ করেননি। যদিও ‘খারাপ প্রতিবেশী’ যে পাকিস্তান, স্পষ্টতই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন।
জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যে ভালো আছে, মন্দও আছে। অধিকাংশই স্বীকার করে সুপ্রতিবেশী মনোভাব থাকলে ভারতের সঙ্গে সঙ্গে তারাও উন্নত হবে।
পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করে জয়শঙ্কর বলেন, ‘যে প্রতিবেশী ক্রমাগত সন্ত্রাসবাদে মদদ দিয়ে যায়, তাকে রুখতে জনগণকে রক্ষা করতে ও দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। সেই পদক্ষেপ আমরা কীভাবে গ্রহণ করব তা কেউ বলে দিতে পারে না। নিজেদের সুরক্ষার জন্য যা করার, দেশ তা করবে।’
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানি চুক্তির অবতারণা করেন। তিনি বলেন, পানি চুক্তি করা হয়েছিল সুপ্রতিবেশীসুলভতার পরিচয় দিয়ে। কিন্তু দশকের পর দশক ধরে সন্ত্রাসবাদে মদদ দিয়ে আসবে আবার পানিবণ্টনের অনুরোধ করবে তা হতে পারে না।
প্রতিবেশীসুলভ আচরণের ব্যাখ্যা করে জয়শঙ্কর বলেন, সাধারণভাবে প্রতিবেশীর সঙ্গে সবাই ভালোই আচরণ করে। প্রতিবেশী অসুবিধায় পড়লে সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়। কিছু না হলেও ‘হাই হ্যালো’ সম্পর্ক থাকে। বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। দেশ হিসেবেও প্রতিবেশীদের সঙ্গে এমনই আচরণ করা হয়ে থাকে। এই সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবেরই নিদর্শন দেখা যায় ভারতের প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রে। তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো হয়েছে। বিনিয়োগ করা হয়েছে। কোভিডের সময় অধিকাংশ প্রতিবেশী ভারত থেকেই প্রথম প্রতিষেধক (টিকা) পেয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় খাদ্য, সার ও জ্বালানিসংকট দেখা গিয়েছিল। ভারত সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কার দুর্দিনে ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য করেছে। সম্প্রতি ‘দ্বিতয়া’ সাইক্লোনের সময়েও শ্রীলঙ্কার জন্য প্রথম সাহায্য ভারতই পাঠিয়েছে। সবাই জানে, বিপদের সময় ভারত আছে। এগিয়ে আসবে। ভারতের ওপর নির্ভর করা যায়।
জয়শঙ্কর বলেন, এমন নয় যে শুধু সংকটকালেই ভারত যায়। প্রতিবেশীর জন্য বিদ্যুতের গ্রিড তৈরি, রাস্তা নির্মাণ, বন্দর তৈরি, বাণিজ্য বৃদ্ধি, পর্যটন বৃদ্ধি, চিকিৎসার জন্য আসা মানুষদের সাহায্য করা—এই সবই সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ ও মনোভাব। এই মনোভাব ইতিবাচক। এরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করে তিনি ‘পশ্চিম প্রান্তের খারাপ প্রতিবেশীর’ প্রসঙ্গে সন্ত্রাসে মদদের উদাহরণ টানেন।
পরে জয়শঙ্কর বলেন, ‘সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের বার্তাই আমি বাংলাদেশে দিয়ে এসেছি। এই মুহূর্তে তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেই দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা তাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। আশা করি, সবকিছু থিতু হলে এ অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ মনোভাব বাড়বে।’