দিল্লি দাঙ্গায় দায়ী ঘৃণা ভাষণ, প্রচারমাধ্যমও: নাগরিক কমিটির প্রতিবেদন

দিল্লি দাঙ্গার সময় পুড়িয়ে ফেলা একটি আবাসিক এলাকায় টহল দিচ্ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা
ছবি: এএফপি

দিল্লি দাঙ্গা আচমকা ঘটেনি, ঘটানো হয়েছিল। দিনের পর দিন বিজেপি ও অন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতাদের ঘৃণা ভাষণ, কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমের উগ্র প্রচার এবং পুলিশ ও সরকারের ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ওই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার কারণ। ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন ‘কনস্টিটিউশনাল কন্ডাক্ট গ্রুপ’ দিল্লি দাঙ্গার তদন্তে যে নাগরিক কমিটি গঠন করেছিল, তার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। আজ শুক্রবার এই প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।

দাঙ্গার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দিল্লি পুলিশ, রাজ্য সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকাকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে তদন্ত কমিশন গঠিত হওয়া উচিত। ২০২০ সালের ২৩ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি উত্তর-পূর্ব দিল্লির ওই দাঙ্গায় মোট ৫৩ জন নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৪০ জন মুসলমান ও ১৩ জন হিন্দু।

তদন্তে নিযুক্ত নাগরিক কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন বি লোকুর। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আইন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান এবং মাদ্রাজ ও দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি এ পি শাহ, দিল্লি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি আর এস সোধি, পাটনা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি অঞ্জনা প্রকাশ ও সাবেক কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব জি কে পিল্লাই। প্রতিবেদনে ‘সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয়’ উপলব্ধি করে তাঁরা বলেছেন, ঘৃণা ভাষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে দৃঢ় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রাতিষ্ঠানিক অনীহাও ছিল প্রকট।

ঘৃণা ভাষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক অনীহার’ পাশাপাশি একশ্রেণির মিডিয়ারও কড়া সমালোচনা করে হয়েছে এই তদন্ত প্রতিবেদনে। দেশের প্রথম সারির ছয়টি নিউজ চ্যানেলের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে যে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ সারা দেশের বিভিন্ন অংশে সংগঠিত হচ্ছিল, ওই চ্যানেলগুলোর প্রতিবেদন ও ব্যাখ্যায় তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘হিন্দু-মুসলমানের’ লড়াই। মুসলমান সম্প্রদায়কে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল। সিএএ–বিরোধী বিক্ষোভ ‘অপমানজনক’ আখ্যা দিয়ে জবরদস্তিপূর্বক তা বন্ধ করার দাবি তারা জানাচ্ছিল। তারা চক্রান্তের তত্ত্ব প্রচার করে গেছে ক্রমাগত। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই চ্যানেলগুলোর মধ্যে দুটি ইংরেজি—রিপাবলিক ও টাইমস নাউ; বাকি চারটি হিন্দি—আজ তক, জি নিউজ, ইন্ডিয়া টিভি ও রিপাবলিক ভারত।

ঘৃণা ভাষণের ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদনে উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা যতি নরসিংহানন্দ, রাগিনী তিওয়ারির পাশাপাশি নাম উল্লেখ করা হয়েছে বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরের। বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে তাঁরা আন্দোলনকারীদের ‘গাদ্দার’ বা বিশ্বাসঘাতক বলেছেন। তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলার (গোলি মারো) নিদান দিয়েছেন। ক্রমাগত ঘৃণা ভাষণ সত্ত্বেও দিল্লি পুলিশ নির্বিকার থেকেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে ব্যর্থ হয়েছে। ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি দিল্লি পুলিশ ও সরকারি কর্তারা ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ বলা সত্ত্বেও জমিতে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। ২৬ তারিখের আগে পর্যাপ্ত পুলিশও মোতায়েন করা হয়নি। অথচ প্রাণ বাঁচাতে অসহায় মানুষ পুলিশকে ফোনের পর ফোন করে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যর্থ, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। একমাত্র নিরপেক্ষ তদন্তেই সত্য উদ্‌ঘাটিত হতে পারে।

দাঙ্গার অপরাধে ধৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী আইন ও বেআইনি কার্যকলাপ রোধ আইনে (ইউএপিএ) মামলা করা হয়েছে। নাগরিক কমিটির তদন্তে কিন্তু তার কোনো প্রমাণ বা ভিত্তি চোখে পড়েনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি, যাতে প্রতিপন্ন হয় যে ধৃতরা দেশের ‘একতা, অখণ্ডতা, সংহতি, নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব’ নষ্টের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। এ–ও বোঝা যায়নি যে সিএএ প্রত্যাহারের দাবি যাঁরা জানাচ্ছিলেন, তাঁরা সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে উদ্যত। ইউএপিএ আইনে ধৃতদের মুক্তি পাওয়া কঠিন। বিচারাধীন বন্দিত্বই শাস্তির শামিল। সেই আইন পর্যালোচনার সুপারিশও কমিটির প্রতিবেদনে করা হয়েছে।