পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির, হারলেন মমতাও
নির্বাচনী দামামা বাজার দিন থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলে এসেছেন, জনসংঘের জন্মদাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যের ক্ষমতা দখল করা তাঁর অধরা স্বপ্ন। কী আশ্চর্য, তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে সেই রাজ্য দখলের স্বপ্ন তাঁর সাকার হতে চলেছে।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে ভোট গণনার ফলাফলের যে ধারা, সন্ধ্যা পর্যন্ত যা বিচ্যুতিহীন, তাতে স্পষ্ট, প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসছে বিজেপি। গতকাল রাত একটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩ (একটি আসনে ভোট গ্রহণ নতুন করে হবে) আসনের ফলাফলে বিজেপি ২০৬টিতে হয় জয়ী ঘোষিত, নয়তো এগিয়ে রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এমন আসনসংখ্যা ৮০–এর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। তৃণমূলের প্রধান ও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজ আসনে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন। ফল ঘোষণার আগে এই আসনের ভোটগণনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে মমতা সাংবাদিকদের বলেন, এবারের নির্বাচনে ১০০টিরও বেশি আসন লুট করা হয়েছে। এ সময় তিনি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় তৃণমূল। ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বাম ফ্রন্টকে হারিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে মমতার দল তৃণমূল। এবার সেখানে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি।
বিজেপির এই জয় অনেক দিক থেকেই অভিনব। যেমন দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বুথফেরত সমীক্ষকদের অধিকাংশ দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল। অথচ দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতির পরম্পরা মেনে এবারও ভোটাররা একটি দলকেই প্রাধান্য দিয়ে বেছে নিয়েছেন, যা নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা দিয়েছে বিজেপিকে। অবস্থাটা এবার এমন যে সোমবার বিকেল পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কালিম্পং এবং দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়ায় তৃণমূল কংগ্রেস একটিও আসন পায়নি। এই জেলাগুলোর ৫৬টি আসনই বিজেপি ছেঁকে তুলে নিয়েছে।
উত্তরবঙ্গে বিজেপি বরাবরই শক্তিশালী। যেমন দক্ষিণবঙ্গে তৃণমূল এযাবৎ কাউকে দাঁত ফোটাতে দেয়নি। গতবার কলকাতা (১১), হাওড়া (১৬), দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা (৩১) ও পূর্ব বর্ধমানে (১৬) একটি আসনও তৃণমূল অন্য কোনো দলকে জিততে দেয়নি। এবার বিজেপি সর্বত্র থাবা মেরেছে। উত্তর চব্বিশ পরগনার ৩৩টি আসনের মধ্যে গতবার বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৬টি। এবার ১৮টি আসন তারা ছিনিয়ে নিতে যাচ্ছে। গতবারের জেতা ৭৭ আসন এবার প্রায় দুই শতে পৌঁছে যাবে, এ ধারণা কেউ দিতে পারেননি। বিজেপির ভোট প্রাপ্তির শতাংশের হার প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে এবার হতে চলেছে ৪৫ শতাংশের মতো। তুলনায় তৃণমূলের ভোটের হার কমে হয়েছে ৪১ শতাংশ। সব দিক থেকেই প্রতিপক্ষকে টেক্কা দিয়েছে বিজেপি।
তিন কারণ বড়
কী করে এই অসম্ভব সম্ভব হলো, দিনভর তা নিয়েই চলেছে গবেষণা। তিনটি কারণ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রথম কারণ, নির্বাচন কমিশনের অতি তৎপরতা। গত বছরের শেষার্ধে নির্বাচন কমিশন সারা দেশের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। লক্ষ্য, ভুয়া ভোটারের পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ তালিকা থেকে হটানো। বিজেপি নেতারা বারবার তা মনেও করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, এক কোটি অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাকে বাছাই করা হবে। বিহার রাজ্যে ভোটের আগে এই সংশোধনের কাজে হাত দেওয়া হয়। সেই ভোট মিটতেই পশ্চিমবঙ্গসহ মোট ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে এসআইআরের আওতায় আনা হয়, যদিও কমিশনের গঠনতন্ত্রে এসআইআরের কোনো উল্লেখই নেই। সময়–সময় ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ নির্বাচন কমিশন করেই থাকে।
কিন্তু এবার যেভাবে তা করা হলো, তাতে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় এক কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারালেন। ২৭ লাখ মানুষ ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যানসি’র ফাঁদে আটকে ভোটই দিতে পারলেন না। এসআইআর–আতঙ্ক এমনভাবে মানুষকে শঙ্কাগ্রস্ত করে তোলে—জনতা ভাবতে থাকেন, এবার ভোট না দিলে তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে। এর ফলে দেখা গেল, ২০২৪ সালের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার ৭ কোটি ৬২ লাখের জায়গায় কমে দাঁড়াল ৬ কোটি ৮২ লাখ। ভোটার কমলেও আগেরবারের তুলনায় এবার ভোট পড়ল ৩০ লাখ বেশি।
এসআইআরের কোপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে মুসলমান ও মতুয়া সম্প্রদায়ের ওপর। কেন মুসলমান, তা সহজেই অনুমেয়। তৃণমূল কংগ্রেস তা প্রচারও করেছে। অবশ্য তাদের আশা ছিল, মতুয়া ভোটে কোপ পড়ার ফলে ওই সম্প্রদায় বিজেপির প্রতি রুষ্ট হবে। কিন্তু দেখা গেল, মুসলমান ভোট সব জায়গায় ঢালাওভাবে তৃণমূলের ঝুলিতে আসেনি। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। নাগরিকত্ব আইনে লাভ না হওয়া ও ভোটার তালিকায় নাম না ওঠা সত্ত্বেও মতুয়ারা বিজেপির প্রতি ভরসা রাখতে চেয়েছে। তাদের কথায়, নাগরিকত্ব দিলে দিল্লিই দেবে। দিদি নন। ভোটেও তারই প্রতিফলন ঘটেছে।
তৃণমূল নেতৃত্ব এসআইআরকেই হাতিয়ার করেছিল ভোটের প্রচারে। কমিশনের সিদ্ধান্তের দরুন সাধারণ মানুষকে যে নিদারুণ কষ্ট সহ্য করতে হয়, তা তারা বাংলার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরে। মমতার ছবি দিয়ে তাদের স্লোগানই ছিল, ‘যে লড়ছে সবার ডাকে, সেই জেতাবে বাংলা মাকে।’ প্রতিটি ভাষণ তারা শুরু ও শেষ করেছে ‘জয় বাংলা’ বলে। এভাবেই তারা প্রচারের অভিমুখ করে তুলেছিল বাংলা ও বাঙালির জাত্যভিমানকে। বিজেপিকে তারা খাড়া করে ‘বহিরাগত’ হিসেবে; যারা নাকি বাংলার ‘কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবমাননাকারী’।
কিন্তু ফলের গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, জনতা সেই প্রচারে গা করেনি। বরং তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে তৃণমূলের লাগামহীন দুর্নীতি, আইনের শাসনের অপপ্রয়োগ ও রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থবিরতা। দেখা গেল, মোদি–শাহর দুর্নীতিমুক্ত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের প্রতিশ্রুতির ওপর মানুষ ভরসা করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বিজেপি এলে দ্বিগুণ হয়ে যাবে, প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতিতেও নারীরা ভোট দিতে আকৃষ্ট হয়েছে। নারীদের যে সমর্থন এত দিন মমতা পেয়ে এসেছেন, এবার তা মোদির দিকে ধাবিত।
বিজেপির সাফল্যের প্রথম কারণ এসআইআর হলে দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের ওপর কমিশনের বিন্দুমাত্র ভরসা না রাখা। ভোটের তারিখ ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের সাড়ে ছয় শ পুলিশ কর্তা ও আমলাকে সরিয়ে দিয়েছে। ভোট গণনার দায়িত্বে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের না রেখে তা তুলে দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের হাতে। মানুষ যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে মোতায়েন করেছে রাজ্যে। মনে রাখতে হবে, ভারতের মোট কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার কোম্পানি। বুথে বুথে বসানো হয়েছে দুই লাখ সিসিটিভি ক্যামেরা। উদ্দেশ্য, শাসক দল যেন ভুয়া ভোট দিতে না পারে। জবরদস্তি করে ভোট চুরি করতে না পারে।
কমিশনের এই তৎপরতার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারও কিন্তু বসে থাকেনি। নির্বাচন চলাকালে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে তৃণমূলের সেই সব নেতার ওপর, যাঁদের বিরুদ্ধে সিবিআই বা ইডি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত করে চলেছে। তাঁদের ইডি, সিবিআই অফিসে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আয়কর বা অর্থসংক্রান্ত অভিযোগের ফাইল তৈরি হয়েছে। দেশের আর কোনো রাজ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত দিন ধরে এমন নিবিড়ভাবে নির্বাচনী প্রচার চালাননি। সব মিলিয়ে লড়াইটা হয়ে উঠেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে রাষ্ট্রের। অসম এ লড়াই জেতার মতো রসদ ও ক্ষমতা মমতা অর্জন করতে পারেননি।
অতঃপর বাংলাদেশের তিন দিকেই পাকাপাকি ঘাঁটি গেড়ে ফেলল বিজেপি। ত্রিপুরা ও আসামে নিজের ক্ষমতায় ও মেঘালয়ে শাসক জোটের শরিক হিসেবে বিজেপি ছিলই, এবার পশ্চিমবঙ্গেও কায়েম হলো বিজেপির শাসন। এই রাজনৈতিক পালাবদল ভারত–বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে, তা ক্রমেই প্রকাশ্য। অনুপ্রবেশ রোখার বিষয়েও বিজেপির প্রচার অতঃপর কেমন হবে, বাংলাদেশ নিশ্চিতই সে দিকে লক্ষ রাখবে। অঙ্গ (বিহার) ও কলিঙ্গ (ওডিশা) বিজয়ের পর বঙ্গ দখল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদের বাতাসকে ঝড়ে পরিণত করলে বাংলাদেশের দক্ষিণপন্থী রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা–ও লক্ষণীয়।
বিজেপির বঙ্গ বিজয় তিস্তার পানি ভাগাভাগি চুক্তির পথ প্রশস্ত করবে কি? প্রশ্নটি উঠছে, কারণ, মমতার প্রতিরোধের কারণেই এতকাল তিস্তা চুক্তি সম্পাদিত হতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সরকারকে বারবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধ্যবাধকতার দরুন তাঁর পক্ষে চুক্তি নিয়ে এগোনো কঠিন। সেই যুক্তি বা অজুহাত এবার আর খাটবে না। চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্রে এবার আর যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধ্যবাধকতা বাধা হতে পারবে না। ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নের প্রশ্নেও পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার ভিন্নমত খাড়া করতে পারবে না। যেহেতু দুই রাজ্যেই বিজেপি সরকারে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সমস্যার অবসানে এই জয় সহায়ক হবে কি? বাংলাদেশ হয়তো আজ থেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে।