কলকাতায় কমছে দুর্গাপূজা, বাড়ছে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের গণেশপূজা

দুর্গাপূজাফাইল ছবি

কয়েক বছরে বাংলাদেশে দুর্গাপূজার সংখ্যা বাড়লেও কমছে কলকাতায়। পাশাপাশি কলকাতায় বাড়ছে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের অন্যতম প্রধান হিন্দু দেবতা গণেশের পূজা। উত্তর কলকাতায় যেখানে প্রধানত প্রতিমা বানানো হয় সেই কুমারটুলির মৃৎশিল্পী সমিতির সম্পাদক বাবু পালের মতে, দেবী দুর্গার প্রতিমা বানানোর জন্য অর্ডার অন্যবারের চেয়ে কিছু কম।

বাবু পাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘তবে আমি এটা বলব না যে প্রতিমার অর্ডার অনেকটা কমে গেছে, যেমনটা পত্রপত্রিকায় দাবি করা হয়েছে। তবে সামান্য কিছু কমেছে। থিম পূজার জন্য যে প্রতিমার অর্ডার আসত, তা প্রায় আসেইনি। ওই থিম পূজাগুলোয় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। পূজার উদ্যোক্তারা কিছুটা পুরোনো দিনের একচালা মায়ের মূর্তিতে ফিরে গিয়েছেন।’ ‘থিম পূজা’ হলো কোনো একটি বিখ্যাত শিল্পকর্ম, স্থাপত্য বা শিল্পীর চিন্তার ভিত্তিতে তৈরি মূর্তি এবং সেই মূর্তি যেখানে থাকে, সেই বাসস্থান অর্থাৎ প্যান্ডেল, বলেন বাবু পাল।

গত বছর কুমারটুলিতে ৮ থেকে ৯ হাজার প্রতিমা তৈরি হয়েছিল। এই সংখ্যা সামান্যই কমেছে। তবে অন্যান্যবার তার আগের বছরের তুলনায় যেভাবে প্রতিমার বরাত বাড়ে, এবারে তা বাড়েনি।

পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা পাল্টাচ্ছে, বাড়ছে গণেশপূজা

দুর্গাপূজা কমে যাওয়ার নানা কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৃৎশিল্পীরা, কিন্তু সেই কারণে পরে আসা যাবে। তার আগে দেখে নেওয়া যাক উত্তর ও পশ্চিম ভারতের জনপ্রিয় দেবতা গণেশের পূজা কী হারে বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে। পূজার উদ্যোক্তা ও শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যাচ্ছে, গত বছর রাজ্যে ৩০০ গণেশপূজা হয়। এ বছরে কলকাতায় ৮০০ গণেশপূজা হয়েছে। এর একটা বড় অংশই করেছেন পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অবাঙালি সমাজের মানুষ।

গণেশ চতুদর্শীতে কলকাতায় গণেশ দেবতার মূর্তির সামনে আরতি করছেন এক ভক্ত। ১৪ সেপ্টেম্বর

গণেশপূজার উদ্যোক্তাদের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, গণেশপূজা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসা।

বিজেপি প্রধানত উত্তর ভারতের দল এবং গণেশও প্রধানত উত্তর ভারতের দেবতা। হিন্দুধর্মমতে গণেশ আবার দুর্গার পুত্রও বটে। সেই হিসেবে দেবী দুর্গার সঙ্গে তিনিও পশ্চিমবঙ্গে পূজিত হতেন। কিন্তু এখন এককভাবে গণেশের পূজার সংখ্যা বাড়ছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এটা হচ্ছে বিজেপিকে কিছুটা খুশি করতে। কারণ, গণেশ ও বিজেপি উভয়ই উত্তর ভারতের প্রতিনিধি। ভারতে নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে নির্দিষ্ট দেব–দেবীর পূজা জড়িয়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন দুর্গাপূজা, মহারাষ্ট্র বা দিল্লিতে তেমনই গণেশপূজা। পশ্চিমবঙ্গে কয়েক বছর ধরে বিজেপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে গণেশপূজাও বেড়েছে, যার অর্থ রাজনৈতিক চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু বাঙালির ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চরিত্রেরও একটা পরিবর্তন পশ্চিমবঙ্গে ঘটেছে।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন এক সময়ে হিন্দু দেবতা রামকে মূলত উত্তর ভারতের দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের জন্য রয়েছেন দেবী দুর্গা। সেই ধারণার যে পরিবর্তন ঘটছে, তা ২০২৬–এর পূজার চরিত্র থেকেই পরিষ্কার। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে একদিকে দুর্গাপূজা কমছে, অন্যদিকে উত্তর ভারতের অন্যতম প্রধান দেবতা গণেশের পূজা বাড়ছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, আগামী বছরে রামের পূজাও বাড়বে পশ্চিমবঙ্গে।

গণেশপূজা ও বিজেপি

আর গণেশপূজা যে মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদের প্রধান রাজনৈতিক অবলম্বন বা হাতিয়ার, তা বুঝতে পেরে বিজেপির নেতা–কর্মীরা গত কয়েক দিনে প্রবল উৎসাহে গণেশপূজায় যোগ দিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিজেপির ঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র ‘যুগশঙ্খ’। যুগশঙ্খের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ‘রাজ্যে পালাবদলের পর গণেশপূজার মাধ্যমে পূর্ণমাত্রায় ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে বিজেপি। গত দুই দিনের মতো রোববার দলের কর্মীরা তো বটেই, নেতা–নেত্রীরাও পুরোদমে ব্যস্ত ছিলেন এই পূজা নিয়ে। রোববার বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের গণেশপূজার উদ্বোধন পর্ব শুরু হয় বেলা দেড়টা নাগাদ। সেটি ছিল জ্যোতি নগর বন্ধু মহল ক্লাবে। এরপর সোয়া দুইটায় লেক টাউন স্পোর্টিং ক্লাবে।’

এরপর একের পর এক গণেশপূজার উদ্বোধন করেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি। গণেশপূজায় অংশ নেওয়ার ফাঁকে তিনি ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব গোপাল মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি উদ্বোধনও করেন। অর্থাৎ গণেশপূজা পশ্চিমবঙ্গে এবারে পূজা হিসেবে আসেনি, এসেছে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে।

কেন দুর্গাপূজা কমল

এর নানা কারণ ব্যাখ্যা করছেন মৃৎশিল্পী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তাঁরা নানা কথা বলছেন। যেমন কেউ কেউ বলেছেন, কুমারটুলিতে এ বছর প্রতিমার উচ্চতা সর্বোচ্চ ১১ ফুট রাখতে বলা হয়েছে। এর ফলে পূজার যে বাড়তি আকর্ষণ, সেটা খর্ব হয়েছে। পুলিশ আগেভাগেই কুমারটুলিতে এসে ১১ ফুটের বেশি উচ্চতার মূর্তি না বানানোর নির্দেশ দিয়ে গেছে, যা বিসর্জনের সময় মাথার ওপরের ইলেকট্রিক তারের ঝক্কি এড়ানোর পুরোনো সার্কুলার বলে পুলিশ দাবি করেছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটা নিয়ে শিল্পীরা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন। সমিতির কর্মকর্তাদের মতে, গত বছর দেড় শর মতো থিম পূজার প্রতিমা হলেও এবার তা কমে ১০-১২টিতে ঠেকেছে। অনেকে স্বীকার করেছেন যে এবার কাজের পরিবেশ থমথমে। বায়না আগের চেয়ে বেশ কম, কারণ শেষ মুহূর্তে থিম পূজার অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে। অতিরিক্ত শৈল্পিক বা থিমভিত্তিক না করে প্রতিমার মুখ সনাতনী রাখার এক অলিখিত নির্দেশ কাজ করছে, যা নিয়ে বেশির ভাগ মৃৎশিল্পীই মুখ খুলতে অনিচ্ছুক।

অন্যদিকে অবৈধ বালি ও মাটি খাদানের ওপর সরকারের নজরদারির কারণে প্রতিমা গড়ার প্রধান উপাদান বেলে মাটির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে শিল্পীরা বিপাকে পড়েছেন। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূজা সংগঠকদের জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে আঘাত হানে, এমন কোনো থিম–প্যান্ডেল বা প্রতিমা করা যাবে না এবং মহালয়ার আগে কোনো পূজা উদ্বোধন করা যাবে না। এর ফলে যেসব উদ্যোক্তা একটু অন্য রকম প্রতিমা চাইতেন, তাঁরাও এবার প্রতিমার মুখ সনাতনী রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। এর ওপরে সরকারি অনুদান নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বাজেট কমে যাওয়ার কারণে উদ্যোক্তারা খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ কারণে দেড় শর বেশি স্টুডিও এবং ২৫০ কোটি টাকার ব্যবসা–সংবলিত কুমারটুলির অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব মন্দা ও সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করছেন মৃৎশিল্পীরা। ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে একাধিক নতুন ও পুরোনো পূজা সংগঠন জানিয়েছে, তারা এবারে কলকাতায় দুর্গাপূজা করছে না। পুরো পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে হয়তো দেখা যাবে, হিন্দু বাঙালির প্রধান পূজার সংখ্যা এ বছরে বেশ খানিকটাই কমে গিয়েছে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে দুর্গাপূজার সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র আনুষ্ঠানিক তথ্যও প্রকাশ করেছিল। জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালে সে দেশে ৩১ হাজার ৪৬১টি দুর্গাপূজা হলেও ২০২৫ সালে হয়েছিল ৩৩ হাজার ৩৫৫টি পূজা। অর্থাৎ ১ হাজার ৮৯৪টি পূজা বেড়েছিল। অন্যদিকে কলকাতায় দুর্গাপূজার সংখ্যা এ বছরে কমে গেল।