দুই রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায়, এক রাজ্যে পুলিশ মারমুখী হলেও অন্যটিতে সংযত

মারমুখী ভারতের দিল্লি পুলিশ। যন্তর মন্তর অভিমুখে যাত্রা শুরুর পর পুলিশ রায়সানা সড়ক থেকে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার (এনএসইউআই) বিক্ষোভকারীদের আটক করে। ২ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লিছবি: এএনআই

লোহা গরম থাকতেই ঘা মারার সিদ্ধান্ত নিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল শুক্রবার মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কের বিপুল সমাবেশে উদ্বুদ্ধ হয়ে রাতেই সিজেপি নেতৃত্ব তাদের পরবর্তী কর্মসূচির কথা জানিয়ে দিয়েছে। মধ্যরাতে ‘এক্স’ হ্যান্ডেল মারফত সিজেপি আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে ঘোষণা দেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ১০ অক্টোবর হবে তাঁদের যন্তর মন্তর ২.০ অভিযান।

সেই বার্তায় গণতন্ত্রপ্রিয় জনতা, যাঁরা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিশ্বাসী, তাঁদের প্রত্যেককে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দিপকে বলেছেন, দিল্লি পুলিশ যেখানে বাধা দেবে, সেই স্থানই হয়ে উঠবে যন্তর মন্তর।

অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, ‘আমাদের এই আন্দোলন পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ হবে। মহাত্মা গান্ধীর দেখানো পথে আমরা হাঁটব। আমাদের নিয়ে কী করবে, তা সরকার ও দিল্লি পুলিশকে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখানোর অধিকারকে তারা শ্রদ্ধা দেখাবে, নাকি ২০ জুলাইয়ের নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, সেটা তাদের ব্যাপার। এই লড়াই গণতন্ত্র রক্ষার। গণতন্ত্রপ্রিয় সবার উচিত এই লড়াইয়ে শামিল হওয়া।’

ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) নামে জ্ঞানেশ কুমারের ‘স্বৈরাচারী ও একতরফা আচরণের’ প্রতিবাদ, তাঁর অপসারণ ও এসআইআর খারিজের দাবিতে বিজেপিবিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ ও সিজেপি গত শুক্রবার গান্ধীজয়ন্তীর দিন থেকে আলাদাভাবে আন্দোলন শুরু করেছে।

‘ইন্ডিয়া’ জোট ২ থেকে ৮ অক্টোবর রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের সর্বত্র আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। সিজেপি আন্দোলন শুরু করেছে মুম্বাই থেকে। সেই সমাবেশের সাফল্য দেখে গতকাল শুক্রবার রাত সোয়া ১১টায় সিজেপি নেতৃত্ব তাদের চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করে দেয়। বোঝাই যাচ্ছে, লোহা গরম থাকতে থাকতেই জেন-জি তাতে ঘা মারতে চাইছে।

গান্ধীজয়ন্তীতে এ আন্দোলন ঘিরে দেশবাসী দুই ধরনের সরকারি মনোভাবের পরিচয় পেল। মহারাষ্ট্রের মুম্বাই ও দিল্লি—একই দেশের দুই রাজ্যের রাজধানী। দুই রাজ্যেই একই দলের শাসন। কেন্দ্রেও সেই দলেরই সরকার। অথচ দেখা গেল, ককরোচদের শিবাজি পার্কের সমাবেশ ঘিরে মুম্বাই পুলিশ যখন আপাত উদাসীন, সমাবেশ বন্ধে বিন্দুমাত্র তৎপরতা নেই, শক্তি প্রয়োগ নেই, জেন-জিদের কোনো রকম বাধা নেই, দিল্লিতে তখন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর লুটেন্স দিল্লি মুড়ে দেয় নিরাপত্তারক্ষী বাহিনী। যন্তর মন্তরগামী প্রতিটি রাস্তায় গড়ে তোলা হয় ব্যারিকেড। হাজার হাজার সশস্ত্র পুলিশ, র‍্যাফ, আধা সামরিক বাহিনী জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ও কয়েক শ গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে। যখন যেখান থেকে যাঁরাই মিছিল করে যন্তর মন্তর অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের ঠেকানো হয়েছে। বাস বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অজ্ঞাতস্থানে।

পুলিশি হিসাবে অন্তত ১ হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়েছে সাংবাদিকদেরও। একই দলের অধীনে থাকা দুই রাজ্যের সরকার ও পুলিশের এই ভিন্ন রূপের ব্যাখ্যা চলে দিনভর। কেন মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্ক কাছের তল্লাট গমগমে, কেনই–বা যন্তর মন্তর থমথমে, একই দলের সরকারের এই ভিন্ন মানসিকতার কারণ জানা যায়নি।

জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে শিবাজি পার্কের বিক্ষোভ সমাবেশ ছিল সিজেপির ‘জেল ভরো আন্দোলন’। অথচ মুম্বাই পুলিশ একজনকেও গ্রেপ্তার করেনি। অভিজিৎ দিপকে তাই সহযোগিতার জন্য মুম্বাই পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন। দিল্লিতে নিন্দা করা হয় সরকার ও পুলিশি আচরণের।

শিবাজি পার্কের অভ্যন্তরে সিজেপি আন্দোলনকারীদের অবশ্য ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যেসব রাস্তা পার্কে গিয়ে পড়েছে, সেখানেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। তাঁদের হাতে ছিল সরকারবিরোধী, জ্ঞানেশবিরোধী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহবিরোধী নানা ধরনের পোস্টার।

গতকাল বিকেল চারটে থেকে শুরু হওয়া ওই সমাবেশ চলে সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, সংগীত পরিচালক ও গায়ক বিশাল দাদলানি, চিত্র পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ, হনসল মেহতাসহ বলিউডের অনেকেই মঞ্চে এসে এই আন্দোলনে তাঁদের সমর্থনের কথা জানান।

আন্দোলনে সমর্থন জানাতে মঞ্চে এসেছিলেন গান্ধীজির প্রপৌত্র সমাজকর্মী তুষার গান্ধীও। রাতে মুম্বাইয়ের দাদার এলাকায় বজরঙ্গ দলের কিছু সমর্থকের সঙ্গে জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের বচসা ও হাতাহাতি হয়। পুলিশ দ্রুত পরিস্থিতির সামাল দেয়।

মুম্বাই সমাবেশে অভিজিৎ দিপকে কঠোর ভাষায় মোদির সমালোচনা করে বলেন, ‘গান্ধীজি ভারতের আত্মা, বাবাসাহেব আম্বেদকর দেশের মেরুদণ্ড এবং জওহরলাল নেহরু ভারতের মন। তাঁদের বিকল্প নেই। সমকক্ষও কেউ নন। এ দেশের মানুষের মনে গান্ধীজির হত্যাকারীদের স্থান নেই।’

মুম্বাইয়ে ‘তেলাপোকা’দের এই অভাবিত সমাবেশ দেখে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-এর শরিক ও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল রাতে সিজেপি আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান। দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরে বিমানবন্দরে তিনি বলেন, ‘সিজেপি, ছাত্রসমাজ ও তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলনকে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। অনুরোধ করছি, তাঁদের যেন অত্যাচার করা না হয়।’

তৃণমূলদলীয় রাজ্যসভার সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন মমতার বক্তব্যকেই তুলে ধরে এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘আমরা তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।’

সিজেপি নেতা দিপকে এই সমর্থন জানানোয় মমতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক্স হ্যান্ডলে বার্তা দিয়েছেন।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অভিজিৎ দিপকে। ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ পার্ক, মুম্বাই, ভারত, ২ অক্টোবর
ছবি: এএফপি

নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় নেমেছেন দেশের সাবেক বিচারপতি ও আইনজীবীদের সংগঠন ‘ল’য়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন’(এলএএফসি)। গতকাল এক বিবৃতিতে তাঁরা জানিয়েছেন, এসআইআরের যৌক্তিকতা, সাংবিধানিক বৈধতা, প্রক্রিয়া ও তা খারিজের সার্বিক প্রতিক্রিয়া খতিয়ে দেখবে পাঁচ সদস্যের এক কমিটি।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন বি লোকুর ওই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। অন্য সদস্যরা হলেন—সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক, জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি বদর দুরেজ আহমেদ এবং সাবেক বিচারপতি রেখা শর্মা ও অঞ্জনা প্রকাশ।

এই কমিটিকে আইনগত পরামর্শ দেবেন ভারতের কপিল সিব্বাল, প্রশান্ত ভূষণ, প্রশান্তচন্দ্র সেন, চন্দ্র উদয় সিং, রাজু রামচন্দ্রন, ওয়ারিসা ফরাহাত, বৃন্দা গ্রোভার ও রেবেকা মেমেন জনের মতো বিশিষ্ট আইনজীবীরা।