কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম ইনস্টিটিউটে হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, শিক্ষকসহ আহত অনেকে

সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই) আজ রোববার একটি অনুষ্ঠান ঘিরে ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের’ কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে (এসআরএফটিআই) আজ রোববার একটি অনুষ্ঠান ঘিরে ‘অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের’ কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে শিক্ষকসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। তবে রাত ৯টার দিকেও সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

জানা গেছে, আজ এসআরএফটিআইয়ের প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েত (এবিজিপি)। সাধারণ শিক্ষার্থীরা আয়োজকদের কাছে জানতে চান, প্রতিষ্ঠানের ভেতর কেন রাজনৈতিক অনুষ্ঠান করা হচ্ছে? এ নিয়ে দুই পক্ষের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। শিক্ষার্থীরা ওই অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাঁদের তীব্র বচসা বাধে, যা ক্রমে সংঘর্ষে গড়ায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দ্রুত পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্যাম্পাসের ভেতরেই হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। ছাত্রছাত্রীরাই বেশি মার খেয়েছেন। সংঘর্ষে কয়েকজন শিক্ষকও আহত হয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে তাঁদের মারধর করেছে। এমনকি ছাত্রদের ‘দেশবিরোধী’, ‘নকশাল’, ‘বাংলাদেশি’ ও ‘জঙ্গি’ বলেও কটূক্তি করা হয়েছে।

এসআরএফটিআইতে বেশ কিছু বাংলাদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। ভাষা ও সংস্কৃতিগত সাদৃশ্যের কারণে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই শিক্ষায়তনে পড়াশোনার আগ্রহ রয়েছে।

সংঘর্ষে শিক্ষকসহ উভয় পক্ষের অনেকে আহত হয়েছেন
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

অনুষ্ঠান আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগ, তাঁরা অর্থের বিনিময়ে এসআরএফটিআইয়ের প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁদের নির্ধারিত কর্মসূচি চলছিল। সেই সময় শিক্ষার্থীরা তাঁদের ওপর হামলা চালায়। তাঁদের অনুষ্ঠানের পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি স্বামী বিবেকানন্দের ছবিও ভাঙচুর করা হয়েছে।

আয়োজকদের দাবি, ঘটনায় তাঁদের চারজন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বহিরাগতরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে। নারী শিক্ষার্থীরাও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।

এমনকি ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন এক শিক্ষার্থী।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাত ৯টার দিকেও সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত সিপিসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। তবে প্রথমে পুলিশকে ক্যাম্পাসে ঢোকার অনুমতি দেয়নি এসআরএফটিআই কর্তৃপক্ষ।

পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেখে পাঁচিল টপকে পুলিশ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। পাঁচিল টপকে নিজে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢোকেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (ইস্ট)। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের বাইরে সাধারণ মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাতেও এসআরএফটিআই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

কিছুদিন আগে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজের একদল ছাত্র অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন ও তাঁর প্রশাসনিক জীবনের ২৫ বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে আয়োজিত ‘নমো সেবা: দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ নামক একটি নাটকে অংশ নিতে অস্বীকার করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে কলেজের অধ্যক্ষ মধুমঞ্জরী মণ্ডল এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ ও অস্থিরতার মধ্যে রাতে সেখানে উপস্থিত হয়ে বিতর্কের জন্ম দেন যাদবপুর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী ভট্টাচার্য।

এই ঘটনার জেরে ৯ সেপ্টেম্বর গোলপার্ক থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’ নামক পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। রাজ্যের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ পদযাত্রার নেতৃত্ব দেন। সেখানে বিজেপি সমর্থকদের সঙ্গে অর্ধনগ্ন নাগা সন্ন্যাসীদেরও অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়, যা প্রবল বিতর্কের সূচনা করে।

এই পটভূমিতে আজ এসআরএফটিআইয়ের মতো বিশেষায়িত ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানেও সেই ছায়া নেমে আসতে দেখে শিক্ষকমহলের অনেকে আশঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেই বহিরাগত বা উগ্র রাজনৈতিক প্রভাব অনায়াসে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে।