মহারাষ্ট্রের পৌর নির্বাচনে জোটে জগাখিচুড়ি, রাজনীতির জটিল সমীকরণ

মহারাষ্ট্র রাজ্যের বিএমসি নির্বাচন ঘিরে একই মঞ্চে শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে ও মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ প্রধান রাজ ঠাকরে। ১১ জানুয়ারি ২০২৬, মুম্বাইছবি: এএনআই

ভারতের মহারাষ্ট্রের পৌরসভা ভোট এমন সব জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজ্য রাজনীতির চরিত্র বদলে দিতে পারে। নতুন বিন্যাস ঘটতে পারে বিজেপি-শিবসেনা-এনসিপির তৈরি ‘মহাযুতি’ এবং কংগ্রেস-শিবসেনা (উদ্ধব) ও এনসিপির (শরদ) ‘মহাবিকাশ আঘাড়ি’ জোটে। শেষ পর্যন্ত এই বিচিত্র সমীকরণ কোন আকার নেবে বা নিতে পারে, এখনো অজানা।

মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন পৌরসভার ভোট শুরু হয়ে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই মুম্বাইয়ে। সেখানে বৃহন্মুবাই পৌরসভার (বিএমসি) ভোট আগামী বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি। শেষবার এই পৌরসভার ভোট হয়েছিল ২০১৭ সালে। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা সেই ভোটে মোট ২২৭ ওয়ার্ডের মধ্যে ৮৪টিতে জয়ী হয়েছিল। বিজেপির সমর্থনে বোর্ড গড়েছিল উদ্ধবের দল।

২০১৯ সালে বিধানসভার নির্বাচনের পর বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করে কংগ্রেস ও এনসিপির সমর্থনে পৌরসভা চালাতে থাকে শিবসেনা। কিন্তু ২০২২ সালে মেয়াদ ফুরানোর পর বিএমসি চলতে থাকে প্রশাসকের নির্দেশে। এবার হতে চলেছে ভোট।

বিএমসি ভারতের সবচেয়ে ধনী পৌরসভা। এর সঙ্গে রাজ্যের অন্যান্য পৌরসভার ভোট ঘিরেই গড়ে উঠেছে বিচিত্র সব রাজনৈতিক বিন্যাস, যা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণের ক্যানভাস নতুন রঙে রাঙাতে পারে।

বিএমসি দখলে রাখতে এবং মারাঠি জাতিসত্তা ও অস্মিতা ধরে রেখে রাজ্য রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকার তাগিদে দুই দশকের বিচ্ছিন্নতা দূর করে কাছাকাছি এসেছেন উদ্ধব ও রাজ ঠাকরে। বালাসাহেব ঠাকরে শিবসেনার উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে উদ্ধবকে বেছে নিলে ভ্রাতুষ্পুত্র রাজ ঠাকরে ২০০৫ সালে দল ত্যাগ করে গড়ে তুলেছিলেন নিজের দল ‘মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা’।

২০ বছরের রাজনীতি সত্ত্বেও মহারাষ্ট্র তো দূরের কথা, মুম্বাইয়েও রাজ নিজের আসন পাকা করতে পারেননি। উদ্ধবও পারেননি বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করার পর দলের ভাঙন ঠেকাতে। শিবসেনা ও এনসিপিতে ভাঙন ধরিয়ে বিজেপি রাজ্য শাসন করছে। এ পরিস্থিতিতে বিএমসি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তলিয়ে যাওয়া দুই ভাই উদ্ধব ও রাজ ভেসে থাকার চেষ্টা করছেন। দুজন জোটবদ্ধ হয়েছেন। ‘মারাঠা মানুষ’ স্লোগানকে পুনরুজ্জীবিত করে দখল নিতে চাইছেন বিএমসির।

একই চিত্র পাওয়ার পরিবারে

ঠাকরে পরিবারের মতো পাওয়ার পরিবারের ছবিটাও অভিন্ন। প্রবীণ ও অশক্ত হয়ে পড়া এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ারের পরিবারেও বিজেপি ভাঙন ধরিয়ে দেয় শারদের ভাইপো অজিতকে দিয়ে। এনসিপি রাজনীতিতে শারদের স্নেহচ্ছায়ায় প্রতিপালিত অজিতের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ এনেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীই।

প্রকাশ্য জনসভায় বলা নরেন্দ্র মোদির সেই অভিযোগের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল অজিতকে কারাগারে পোরার হুমকি। তারপরই অজিত পাওয়ার এনসিপিতে ভাঙন ধরিয়ে বিজেপির হাত ধরে মহাযুতি সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলেন। কিন্তু কাকা শারদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি কখনো। কাকা বা শারদের কন্যা এনসিপির লোকসভা সদস্য সুপ্রিয়া সুলের বিরুদ্ধে একবারের জন্য কটূক্তিও করেননি।

মঞ্চে মহারাষ্ট্র রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাডনবিস, উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডেসহ জোটের অন্য নেতারা। ১১ জানুয়ারি ২০২৬, মুম্বাই
ছবি: এএনআই

এবার পুনে পৌরসভা দখলে রাখার মরিয়া প্রচেষ্টায় পাওয়ার পরিবারের দুই শিবির হাত মিলিয়েছে। এনসিপির দুই শিবির নিজেদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে লড়াইয়ে অবতীর্ণ। মুম্বাইয়ে যেমন ‘ঠাকরে ব্রাদার্স’ জোট বেঁধেছেন, পুনেতে তেমনি কাকা-ভাইপো জুটি হাত মিলিয়েছেন।

জোট নিয়ে শারদ-কন্যা সুপ্রিয়া শুধু বলেছেন, নতুন দল গড়লেও অজিত পাওয়ার বারবার বলেছেন, দলের আদর্শ তিনি ত্যাগ করেননি। অজিত আবার বলেছেন, তিনি মহাযুতি জোটের সঙ্গেই রয়েছেন।

বিজেপি ও কংগ্রেসও অভিন্ন নয়

শিবসেনা ও পাওয়ার পরিবারের মতো না হলেও পৌরসভা ভোটকে কেন্দ্র বিজেপিও যে চমক সৃষ্টি করেনি, তা নয়। এমনকি কংগ্রেসও। বস্তুত, নীতি ও আদর্শ পাশে ঠেলে কী বিচিত্র ধরনের চমক সৃষ্টি হতে পারে, মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পৌরসভার নির্বাচন তার উদাহরণ হয়ে রইল।

যেমন অম্বরনাথ পৌরসভা। সেখানে মেয়র নির্বাচনে একনাথ শিন্ডের শিবসেনার বিরুদ্ধাচরণ করেছে বড় শরিক বিজেপি। কংগ্রেসের সাহায্য নিয়ে বিজেপি সেখানে মেয়র নির্বাচনে হারিয়ে দিয়েছে একনাথ শিন্ডের প্রার্থীকে। ক্ষুব্ধ শিন্ডে বিজেপিকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছেন।

এনসিপির একাংশের নেতা মহারাষ্ট্র রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার ও শারদ পাওয়ারের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে। ১০ জানুয়ারি ২০২৬, পুনে
ছবি: এএনআই

আবার আকোট পৌরসভায় কংগ্রেসকে দূরে রাখতে বিজেপি মেয়র নির্বাচনে সাহায্য নিয়েছে হায়দরাবাদের আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল এআইএমআইএমের সঙ্গে। বেজায় অস্বস্তিতে পড়ে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব বলেছেন, এই জোট মানা হবে না।

কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, আরজেডিসহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অনেকেই এআইএমআইএমকে বিজেপির ‘বি টিম’ বলে থাকেন। আকোট পৌরসভার ভোট সে মন্তব্যকে জোরালো করে তুলেছে।

ভবিষ্যতের রাজনীতি কোন দিকে এগোবে

মহারাষ্ট্র পৌরসভার এসব বিচিত্র রাজনৈতিক সমীকরণ ভবিষ্যৎ জোটবদ্ধতার ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ওই রাজ্যে এই সমীকরণ কংগ্রেসকে দাঁড় করিয়েছে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে।

কংগ্রেস বরাবরই শিবসেনার উগ্র আঞ্চলিকতাবাদী রাজনীতির বিরোধিতা করে এসেছে। শিবসেনার রাজনীতিকে কংগ্রেস সব সময় সাম্প্রদায়িক বলেও মনে করেছে। কিন্তু বিজেপির বিরোধিতা করে উদ্ধব ঠাকরের এনডিএ জোট ত্যাগের পর শিবসেনাকে জোটে নিতে কংগ্রেস দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও আপত্তি করেনি। উদ্ধবের শিবসেনার সঙ্গে মহারাষ্ট্রে কংগ্রস ও এনসিপি জোটবদ্ধ হয়ে তৈরি করে ‘মহাবিকাশ আঘাড়ি’ জোট। উদ্ধব সেই সূত্র ধরে যোগ দেন ‘ইন্ডিয়া’ জোটেও।

উদ্ধবের চেয়েও উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজ ঠাকরে। দুই ভাই জোটবদ্ধ হওয়ায় কংগ্রেস এখন দিশাহীন। পৌরসভা ভোটে তারা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ভোটের পর রাজ ঠাকরের দল ‘ইন্ডিয়া’য় শামিল হতে চাইলে কী করবে কংগ্রেস ও অন্য ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো, যারা আঞ্চলিকতাবাদে বিশ্বাসী নয়?

অন্যদিকে দুই ‘পাওয়ার’ পরিবার হাতে হাত মেলানোয় বিজেপিও চিন্তিত। অজিত পাওয়ার বলেছেন, তিনি এনডিএ জোট ছাড়ছেন না। শারদ পাওয়ারও ‘ইন্ডিয়া’ ছাড়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। তাহলে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে পাওয়ার পরিবারের অবস্থান কী হবে? এনসিপির দুই অংশ মিশে গেলে মহারাষ্ট্র ও জাতীয় রাজনীতির সমীকরণই–বা কী হবে, এখনো কেউ নিশ্চিত নয়।

সব মিলিয়ে মহারাষ্ট্রের পৌরসভা ভোট অদ্ভুত ধরনের একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ভোটের ফল প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, সম্ভাব্য রাজনৈতিক মেরুকরণের ছবিটা কেমন হবে।