চাচার হাত ধরে রাজনীতিতে এলেও নিজের পথ নিজেই তৈরি করেন অজিত

দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার কয়েক দিন আগে চাচা এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ারের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও এনসিপির আরেকাংশের প্রধান অজিত পাওয়ার। ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, বারামতি, পুনেছবি: এএনআই

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের অজিত পাওয়ারের পুরো রাজনৈতিক জীবন চাচা শারদ পাওয়ারের বিশাল ব্যক্তিত্বের ছায়ায় শুরু হয়েছিল। তবে সব সময় তাঁর নিজের আলাদা একটি পরিচয় তৈরির তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। শারদ পাওয়ারের বড় ভাই অনন্ত রাওয়ের ছেলে অজিত পাওয়ার সমবায় খাতের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন এবং চাচার হাত ধরেই জনসেবায় প্রবেশ করেন।

১৯৫৯ সালে জন্ম নেওয়া অজিত ১৯৯১ সালে বারামতি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন। কিন্তু পরে তিনি সেই পদ ছেড়ে দেন, যাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া শারদ পাওয়ার ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।

১৯৯৫ সালে বারামতি আসন থেকে রাজ্য বিধানসভার বিধায়ক (এমএলএ) পদে নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যে তাঁর দীর্ঘ সংসদীয় যাত্রা শুরু হয়। এই আসনে কয়েক দশক ধরে তাঁর চাচা প্রতিনিধিত্ব করতেন। এরপর ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা সব নির্বাচনে তিনি এই আসন ধরে রাখেন এবং পশ্চিম মহারাষ্ট্রের অন্যতম শক্তিশালী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

পাওয়ার পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো অজিত পাওয়ারও সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে নিজের ভিত্তি তৈরি করেন। ১৯৯৯ সালে শারদ পাওয়ার যখন কংগ্রেস ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন, তখন থেকেই অজিত নিজেকে চাচার স্বাভাবিক উত্তরসূরি হিসেবে ভাবতেন।

মাত্র ৪০ বছর বয়সে ১৯৯৯ সালে অজিত পাওয়ার মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হন। পরে সেচ, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি পুরো রাজ্যে, বিশেষ করে পশ্চিম মহারাষ্ট্রে নিজের একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং অনুগত অনুসারী তৈরির দক্ষতার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন, যা পাওয়ার পরিবারের ভেতরেও কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

২০০৯ সালে শারদ পাওয়ারের মেয়ে সুপ্রিয়া সুলে রাজনীতিতে আসার পর উত্তরাধিকার নিয়ে জল্পনা আরও বৃদ্ধি পায়। পরে তৃতীয় প্রজন্মের নেতা রোহিত পাওয়ারের উত্থান এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিদ্রোহ ও ভাঙন

অজিত পাওয়ার প্রথমবার প্রকাশ্যে দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন ২০০৪ সালে, যখন এনসিপি বড় দল হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসকে মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে দেয়। ২০১২ সালে সেচ কেলেঙ্কারির অভিযোগে তিনি উপমুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সরকারে সংকট তৈরি করেন। যদিও তখন শারদ পাওয়ারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছিল।

২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে এনসিবি ব্যাংক–সংক্রান্ত এক মামলায় নাম আসার পর অজিত পাওয়ার আবেগঘনভাবে পদত্যাগ করে জনগণের সামনে থেকে সরে গিয়েছিলেন। অবশ্য পরে আবার তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ওই বছর লোকসভা নির্বাচনে নিজের ছেলে পার্থ পাওয়ারকে প্রার্থী করতে তিনি চাচা শারদ পাওয়ারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু প্রার্থী দিলেও পার্থ হেরে যান, এতে পারিবারিক দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

২০১৯ সালের নভেম্বরে অজিত সবচেয়ে নাটকীয় পদক্ষেপ নেন। যখন এনসিপি, কংগ্রেস ও শিবসেনার সঙ্গে জোটের কথা চলছিল, তখন তিনি হঠাৎ বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভোরে উপমুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। যদিও সেই সরকার মাত্র ৮০ ঘণ্টা টিকেছিল। এরপর তিনি আবার এনসিপিতে ফিরে আসেন এবং মহাবিকাশ আঘাড়ি (এমভিএ) সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী হন।

২০২৩ সালের চূড়ান্ত বিভক্তি

২০২৩ সালের জুলাই মাসে অজিত পাওয়ার বেশ বড়সংখ্যক বিধায়ক নিয়ে এনসিপি ভেঙে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ‘মহাযুতি’ সরকারে যোগ দেন এবং আবার উপমুখ্যমন্ত্রী হন। এর ফলে পাওয়ার পরিবার ও দল আনুষ্ঠানিকভাবে দুই ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন অজিত পাওয়ারের গোষ্ঠীকেই আসল ‘এনসিপি’ এবং দলীয় প্রতীকের স্বীকৃতি দেয়।

২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অজিত পাওয়ারের দল ৫৯টি আসনের মধ্যে ৪১টিতে জয়ী হয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। তবে নির্বাচনের পর বিজেপির সঙ্গে কিছু বিষয়ে তাঁর টানাপোড়েন শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে কিছু বিপর্যয়ের কারণে গুঞ্জন উঠেছিল, হয়তো আবারও চাচা-ভাইপো এক হতে পারেন।