দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোটে সারা দিনে যা যা ঘটল

ভবানীপুর আসনে ভোটদানের পর হাসিমুখে ‘ভি’ (বিজয়) চিহ্ন দেখাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পেছনে পাহারায় কেন্দ্রীয় বাহিনী। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ২৯ এপ্রিল ২০২৬ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

ভারতের নির্বাচন কমিশনের অধীনে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন-২০২৬–এর দ্বিতীয় ও শেষ দফার ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। বুধবার কলকাতাসহ ৭ জেলার ১৪২টি আসনে দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ হয়। এর আগে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৬ জেলার ১৫২টি আসনে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ হয়েছিল। এদিন দ্বিতীয় দফার নির্বাচনও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বিনা রক্তপাতে শেষ হলো।

তবে এবারের নির্বাচনের মূল আকর্ষণের কেন্দ্র দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর আসন। এই আসনের দুই তারকা প্রার্থী চ্যালেঞ্জ নিয়ে নির্বাচনী ময়দানে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন। দুজনেই এই লড়াইকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে ঘোষণা করে নিজে নিজে জয়ী হওয়ার আশাবাদ জানিয়েছেন।

এই আসনের দুই তারকা প্রার্থী হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিদায়ী বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী।

ভবানীপুর আসনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রতিপক্ষ ও বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

এই শুভেন্দুই সর্বশেষ ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে লড়েছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আসনে। সেই নির্বাচনে মমতা হেরে গিয়েছিলেন মাত্র ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে। পরে ভবানীপুর আসনের বিজয়ী প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় তাঁর আসন ছেড়ে দিলে সেই আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ টিকিয়ে রাখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বুধবার কলকাতাসহ ৭ জেলার ১৪২টি আসনে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি ও নির্বাচন কমিশনের কড়া তদারকিতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। ২০২১ সালের মতো এবার কোনো রক্তপাত ঘটেনি। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা কোনো বড় রূপ নেয়নি। শুধু ভবানীপুর আসনে সামান্য কিছু ঘটনার কারণে তা প্রচারের আলোয় চলে আসে। এই ভবানীপুর আসনের মিত্র ইনস্টিটিউশনে সকালে ভোট দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এখানেই বিকেলে ভোট দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা ও অভিষেক দুজনেই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন।

দুপুরের কিছু আগে মমতার কেন্দ্র কালীঘাট রোডের জয় হিন্দ ভবনে গেলে সেখানে তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চোখে পড়ে। শুভেন্দু অধিকারী নিজের এলাকার ভোট দেখতে জয় হিন্দ ভবনে আসেন। তখনই শুভেন্দুবিরোধী এবং মমতার পক্ষের একদল ভোটার শুভেন্দুকে দেখে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে থাকেন। উত্তরে শুভেন্দুর সমর্থকেরাও ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। এর ফলে পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত সেখানে চলে আসেন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

কলকাতার একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে হুইলচেয়ারে আসা এক ভোটারের সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছেন পাহারায় থাকা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

শুভেন্দুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন মমতার ভাইয়ের স্ত্রী ও কলকাতা পৌর করপোরেশনের কাউন্সিলর কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায়। কাজরীর দাবি, তাঁদের শান্তিপূর্ণ ভোট চলাকালে শুভেন্দু এসে এলাকা উত্তপ্ত করে তোলেন। অন্যদিকে শুভেন্দু দাবি করেন, সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী তৎক্ষণাৎ না এলে বিরোধীরা তাঁর ওপর চড়াও হতেন। পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে কোনো অঘটন ঘটেনি।

শুভেন্দু এ ঘটনার পর বলেছেন, এটা তৃণমূলের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তবু তিনি জোরের সঙ্গে দাবি করেন, এই আসনে তিনিই জিতছেন। অন্যদিকে তৃণমূলের কাজরী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, শুভেন্দুরা এই এলাকায় ঢুকে ভোটে অশান্তি তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা শুভেন্দুকে সেই সুযোগ দেননি।

এরপর নিকটবর্তী যাদবপুর আসনের চারণকবি মুকুন্দ দাস হাইস্কুলের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় বিশাল লাইন। সেখানে শান্তিতেই ভোট চলছিল। ভোটাররা কেউ মুখ খুলতে চাননি। তবে জানিয়েছেন, ভালোই ভোট চলছে, কেউ বিরক্ত করছেন না। যে যাঁর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে যাচ্ছেন। কোনো দলেরই আস্ফালন চোখে পড়েনি। এই কেন্দ্রের প্রার্থী হলেন সিপিএমের প্রখ্যাত আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, তৃণমূলের দেবব্রত মজুমদার এবং বিজেপির অভিনেত্রী শর্বরী মুখার্জি।

ভোটকেন্দ্রের বাইরে এক বয়স্ক ভোটারকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

বিকাশরঞ্জন বললেন, প্রচুর ভোট পড়ছে। বুঝতে পারছেন না কাদের দিকে ভোট যাচ্ছে, এ নিয়ে তিনি চিন্তিত। তবে এবার প্রচুর মানুষ ভোট দিতে পারায় তাঁর ভালো লাগছে। দেবব্রত মজুমদার বললেন, তিনি দুশ্চিন্তা করছেন না। এই আসনে তিনিই জিতবেন। শর্বরীও বলেছেন, এবার পরিবর্তনের দিন আসছে। মানুষ পরিবর্তন চাইছে। তাই তিনি দারুণ আশাবাদী, মানুষ তাঁকে ফেরাবে না। জয় এবার বিজেপিরই হবে।

শেষে টালিগঞ্জ রিজেন্ট পার্ক আজাদগড় গার্লস স্কুলের ভোটকেন্দ্রে গেলে দেখা যায়, সেখানেও ভোটারদের প্রচুর লাইন। ভোট হচ্ছে শান্তিতে। এই টালিগঞ্জ আসনে লড়ছেন তৃণমূলের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, বিজেপির পাপিয়া অধিকারী এবং সিপিএমের পার্থপ্রতিম বিশ্বাস। এবারের নির্বাচনে তিনজনই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। তবে বেশি আশাবাদী তৃণমূল প্রার্থী অরূপ বিশ্বাস। তিনি বলেন, তাঁরা মানুষের জন্য যা করেছেন, সেদিকে তাকিয়ে এলাকার ভোটাররা তাঁদের বঞ্চিত করবেন না। তিনি জয়ের আশা নিয়েই আছেন।

সিপিএম প্রার্থী বলেছেন, মানুষ তো এবার এই বাংলার দুর্নীতিবাজ সরকারকে বিদায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কারণে ত্রিমুখী লড়াইয়ে তাঁরা জিতেও যেতে পারেন। সেখানে পাপিয়া অধিকারীর সাক্ষাৎ মেলেনি। তবে তাঁর এক সমর্থক বলেছেন, যে পরিবর্তনের ঝড় বাংলাজুড়ে চলছে, সেই ঝড়ের ঝাপটা দিদির দলের দিকেই পড়বে। পাপিয়া অধিকারীই এই আসনে জিতবেন।

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তবে কোথাও বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ বা রক্তপাতের খবর পাওয়া যায়নি। এদিন ফলতায় একটি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে বিজেপির প্রতীকে টেপ মারা অবস্থায় পাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীতে বিজেপির প্রার্থীর গাড়ি ও বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া হুগলির চুঁচুড়ায় বিজেপি ও ফরোয়ার্ড ব্লকের কার্যালয় এবং শান্তিপুরে বিজেপির নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। উত্তর ২৪ পরগনার নোয়াপাড়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে যথাক্রমে বিজেপি নেতা অর্জুন সিং ও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে তৃণমূল বিক্ষোভ করেছে। পানিহাটিতে আরজি কর হাসপাতালে নিহত চিকিৎসক অভয়ার মাকে দেখে তৃণমূল সমর্থকেরা বিক্ষোভ দেখান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামে একটি বুথের পাশের পুকুর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া নদীয়ার চাপড়ায় বুথের সামনে বিজেপির এক এজেন্টের মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

যাঁদের ভাগ্য আজ নির্ধারিত হলো

এ দফার নির্বাচনে বহু হেভিওয়েট ও তারকা প্রার্থীর ভাগ্য ইভিএমে বন্দী হয়েছে। সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ভবানীপুর আসনের দিকে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে লড়ছেন বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও বিজেপির বিদায়ী বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। তৃণমূলের অন্যান্য তারকা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতা বন্দরে ফিরহাদ হাকিম, রাসবিহারীতে দেবাশীষ কুমার, চৌরঙ্গীতে নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলেঘাটায় কুণাল ঘোষ, শ্যামপুকুরে শশী পাঁজা এবং দমদমে ব্রাত্য বসু। উত্তর ২৪ পরগনার বিভিন্ন আসনে লড়ছেন বাগদায় মধুপর্ণা ঠাকুর, মধ্যমগ্রামে রথীন ঘোষ, গাইঘাটায় নরোত্তম বিশ্বাস, বাদুরিয়ায় বুরহানুল মোয়াদ্দিম, হাবড়ায় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, আমডাঙ্গায় পীরজাদা কাসেম সিদ্দিকী, বারাকপুরে রাজু চক্রবর্তী, দমদম উত্তরে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, পানিহাটিতে তীর্থংকর ঘোষ, বরাহনগরে সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কামারহাটিতে মদন মিত্র। এ ছাড়া রাজারহাট নিউটাউনে তাপস চট্টোপাধ্যায়, বিধাননগরে সুজিত বসু, রাজারহাট-গোপালপুরে অদিতি মুন্সী, কাকদ্বীপে মন্টুরাম পাখিরা, ক্যানিংয়ে বাহারুল ইসলাম, বারুইপুর পশ্চিমে বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, ডায়মন্ড হারবারে পান্নালাল হালদার, সোনারপুর দক্ষিণে অরুন্ধতী মৈত্র, ভাঙড়ে শওকত মোল্লা ও টালিগঞ্জে অরূপ বিশ্বাস উল্লেখযোগ্য প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।

ভোট দেওয়ার পর হাসিমুখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কালিমাখা আঙুল দেখাচ্ছেন কলকাতা বন্দর আসনের তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

অন্যদিকে বিজেপির ভিআইপি ও তারকা প্রার্থীদের মধ্যে শুভেন্দু অধিকারী ছাড়াও রয়েছেন শিবপুরে রুদ্রনীল ঘোষ, আসানসোল দক্ষিণে অগ্নিমিত্রা পাল, নোয়াপাড়ায় অর্জুন সিং, রাজারহাট-গোপালপুরে তরুণজ্যোতি তেওয়ারি ও সোনারপুর দক্ষিণে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। পানিহাটিতে প্রার্থী হয়েছেন আরজি কর হাসপাতালে খুন হওয়া ছাত্রীর মা রত্না দেবনাথ। এ ছাড়া যাদবপুরে শর্বরী মুখোপাধ্যায়, টালিগঞ্জে পাপিয়া অধিকারী, বেহালা পশ্চিমে ইন্দ্রনীল খান, বালিগঞ্জে শতরূপা, এন্টালিতে প্রিয়াংকা টিবরেওয়াল, মানিকতলায় তাপস রায় ও কাশীপুর-বেলগাছিয়ায় রীতেশ তেওয়ারি নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

বাম ফ্রন্টের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে যাদবপুরে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, পানিহাটিতে কলতান দাশগুপ্ত, বরাহনগরে সায়নদ্বীপ মিত্র, কামারহাটিতে মানস মুখোপাধ্যায় ও দমদম উত্তরে দীপ্সিতা ধর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।