অজানা-অচেনা এই রাহুল গান্ধীকে প্রকাশ্যে এনেছে খাদ্য, ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা ও লাইফস্টাইল কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘কার্লি টেলস’। ভারত জোড়ো যাত্রার এক ফাঁকে রাজস্থানের দৌসা জেলায় রাহুলের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওই সংস্থার সাংবাদিক কামিয়া জানি। কেমন পাত্রী পছন্দ, সেই বিষয়ে কামিয়ার প্রশ্নের জবাবে বিন্দুমাত্র লজ্জিত না হয়ে রাহুল বলেছেন, ‘বুদ্ধিমতী, মানবিক কেউ একজন, যিনি খুব ভালো মনের মানুষ হবেন।’ রাহুল বলেন, বাবা-মায়ের ভালোবাসা তিনি দেখেছেন। সুতরাং ভালোবাসা নিয়ে তাঁর ধারণা খুব উঁচু তারে বাঁধা। তেমন কেউ এলে বিয়ে করতে আপত্তি নেই। বিয়ের বিরুদ্ধে নন তিনি। কামিয়া হাসতে হাসতে বলেন, ‘নারীদের কাছে এই বার্তা কিন্তু চলে গেল।’ শুনে রাহুলের সহাস্য মন্তব্য, ‘আপনি আমাকে বিপদে ফেললেন।’

এই রাহুল একেবারে অচেনা। এভাবে রাহুল আগে কখনো কারও কাছে ধরা দেননি। এভাবে ক্যামেরার সামনে রাহুলকে কেউ কখনো লজ্জায় ফেলেননি, বিড়ম্বনাতেও। ভারত জোড়ো যাত্রা কংগ্রেস নেতাকে অনেক দিক থেকেই বদলে দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারটি শুরু হয় যাত্রাশিবিরে নৈশভোজের আসরে, যেখানে টেবিলে শুধু রাহুল ও কামিয়া। রাহুল জানান, খাবার নিয়ে তাঁর বিশেষ কোনো পিটপিটানি নেই। ‘যা পাই, তা-ই খাই’। তবে কাঁঠাল বা এঁচড় ও কড়াইশুঁটি তাঁর নাপছন্দ। ঝাল খেতেও তিনি পারেন না। আর পছন্দ? অবশ্যই আমিষ খাবার। বিশেষ করে মুরগির মাংস। বাড়িতে দুপুরে হয় ভারতীয় খাবার, রাতে প্রধানত কন্টিনেন্টাল। খাওয়ার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট কঠোর। কার্বোহাইড্রেট অত্যন্ত কম খান। মিষ্টিও। তবে হ্যাঁ, আইসক্রিমের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা তাঁর আছে। সে কথা স্বীকারে দ্বিধা করেননি।  

রাহুলের ছেলেবেলা আর পাঁচজনের মতো ছিল না। দাদি ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর স্কুল যাওয়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পড়াশোনা চলত বাড়িতেই। ইন্দিরা হত্যা তাঁর কাছে ছিল এক বিরাট ধাক্কা। বোর্ডিং স্কুল থেকে বাড়িতে চলে আসতে হয় নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু স্কুলের স্মৃতি এখনো প্রখর। রাহুল বলেন, ‘কেউ কেউ খুব ভালোবাসতেন, কেউ কেউ চরম অপছন্দ করতেন।’ এর কারণ, তাঁদের পরিবারের গরিবমুখী রাজনৈতিক অবস্থান। সেই রাহুল বড় হয়ে অনেক কলেজে অনেক কিছু পড়েছেন। এক বছর ছিলেন দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্সে। ইতিহাস পড়েছেন। তারপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি নিয়ে। বাবা নিহত হলে আবার সেই সমস্যা। নিরাপত্তার প্রশ্ন বড় হয়ে ওঠে। ফ্লোরিডার রলিন্স কলেজে চলে যেতে হয়। অর্থনীতি নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রাহুল স্কুবা ডাইভিং শিখেছেন আমেরিকার ফ্লোরিডায়। ফ্রি ডাইভিংও করেন তিনি। তাইকুডো মার্শাল আর্টে ব্ল্যাক বেল্ট। স্কুলে বক্সিং শিখেছেন। লড়তেনও। ব্যায়াম করেন এখন প্রতিদিন। রাহুল চাকরিও করেছেন একটা সময়। লন্ডনে। স্ট্র্যাটেজিক কনসালটিং সংস্থা ‘মনিটর কোম্পানি’তে। প্রথম বেতন পাওয়ার কথাও তাঁর মনে আছে। সময়ের বিচারে অনেক টাকা। আড়াই কি তিন হাজার পাউন্ড। রাহুলের বয়স তখন ২৫।

রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে। বাড়ির আবহ রাজনৈতিক। দাদি-বাবার মধ্যে রাজনীতির আলোচনা ছোট থেকে শুনে আসছেন। রাজনীতির প্রতি আগ্রহী হওয়া রাহুলের কাছে তাই ছিল স্বাভাবিক। তবু তাঁর মনে হয়, দাদি ও বাবার মৃত্যু তাঁর ওপর প্রচণ্ড এক প্রভাব ফেলেছিল। রাজনীতিমুখী করে তুলেছিল। এমন মৃত্যু অনেককে রাজনীতি বিমুখ করে তোলে। ভয় জেঁকে বসে। রাহুলের তা হয়নি। কারণ, ‘আমরা কোনো দিন কোনো কিছুতে ভীত হইনি। দাদি, বাবা, মা কাউকে ভয় পেতে দেখিনি। ভয় পাওয়ার কোনো কারণই নেই।’

রাহুলকে এই সাক্ষাৎকারে র‌্যাপিড ফায়ার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। পাঁচ সেকেন্ডে উত্তর। তা থেকে জানা যায়, ভাত বা রুটি কোনোটাই রাহুলের পছন্দ নয়। কার্বোহাইড্রেট কম নেন। একান্ত খেতে হলে রুটি। সকালে কফি, সন্ধ্যায় চা। তন্দুরি চিকেন, চিকেন টিক্কা ও ওমলেট প্রিয় খাবার। পছন্দের জায়গা বলে কিছু নেই। নতুন নতুন জায়গা ঘুরতে ভালোবাসেন। পছন্দের রংও কিছু নেই। খুব রেগে গেলে তিনি চুপ করে যান। মনে করেন, প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীরই কিছু না কিছু ভালো দিক রয়েছে। সময় ও পরিস্থিতির বিচারে প্রত্যেকেই ভালো কাজ করেছেন।

রাহুলকে প্রশ্ন করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী হলে কোন তিনটি কাজ প্রথম করবেন। উত্তরে রাহুল প্রথমে বলেন, ‘কে বলতে পারে, কী ঘটতে চলেছে?’ তারপর বলেন, ‘প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করতে চাই। ছোট ছোট ব্যবসায়ী, যাঁরা অসুবিধার মধ্যে রয়েছেন, তাঁদের সাহায্য করতে চাই, যাতে তাঁরা স্বাবলম্বী হয়ে অন্যদের সাহায্যে আসতে পারেন। ছোট ব্যবসায়ীরা বড় হচ্ছেন, এটাই এখন ভারতের বিকাশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এটা না হওয়ার জন্যই আমরা এই প্রবল বেকার সমস্যায় মরছি। অল্প মানুষের কাছে বেশি সম্পদ জড়ো হওয়াটা সমস্যার সমাধান করবে না। এটা দ্বিতীয় কাজ। তৃতীয় কাজ হলো কৃষক, শ্রমিক, বেকারদের রক্ষা। তাঁদের পাশে দাঁড়াব। তাঁদের বোঝাব, আপনাদের পাশে সরকার আছে। রাষ্ট্রের কাজ এটাই। দুর্বলকে রক্ষা করা।’

কেন এই দাড়ি-গোঁফ, সেই ব্যাখ্যাও রাহুল দিয়েছেন। বলেছেন, ‘হঠাৎই মনে হলো, যাত্রা চলাকালে চুল-দাড়ি-গোঁফ কামাব না। খেতে গেলে অসুবিধা হয়। তবে এটা বদলে যাবে।’ রাহুল জানান, দলের অনেকের প্রবল চাপ রয়েছে দাড়ি কাটার।

রাহুল জানিয়েছেন, চলতে চলতে প্রতিদিন অনেক কিছু শিখছেন। জানছেন। মানুষের অভাব, চাহিদা, দুঃখ-কষ্ট ও বেদনার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হচ্ছেন। এই যাত্রা তাঁকে ধৈর্যশীল করে তুলেছে। বিরক্তি চাপা দিতে শিখেছেন। তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষকে জানছি। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি। মানুষ যখন ক্রুদ্ধ হন, রাগ করেন, তখন তার কারণ জানার চেষ্টা করি। কেউ ক্রুদ্ধ হলে আমি কিন্তু রেগে যাই না। রাগের কারণ জেনে তা থেকে শিক্ষা নিই।’

রাহুলের কাছে আধ্যাত্মিকতা হলো সত্য। জীবনকে সততার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এটাই তাঁর কাছে একমাত্র আধ্যাত্মিকতা। ‘মানুষকে ভালোবাসা, বোঝা, তাঁদের কথা শোনা, সহানুভূতিশীল হওয়া, এটাই আমার কাছে ধর্ম।’ তিনি একা একা ঘুরতে ভালোবাসেন। বার্মা (মিয়ানমার) ঘুরেছেন। ইউরোপেও। ব্যাকপ্যাক নিয়ে একা একা বেরিয়ে পড়েছেন। সাইকেল চেপে ঘুরেছেন স্পেন, ইতালি।