পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম কাটার নিশানায় কেন মুসলিমরা বেশি
৯২ লাখের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ ঘোষণা।
বাকি ৩০ লাখ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে যেতে পারবেন। তবে শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না।
যেসব জেলায় মুসলিম বেশি এবং যাঁরা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেন, সেখানেই নাম কাটার হার বেশি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ৭৩ বছর বয়সী নবীজান মণ্ডল ৫০ বছর ধরে ভারতের জাতীয়, রাজ্য বা স্থানীয়—প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি দেখলেন, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) প্রকাশিত ভোটার তালিকা থেকে তাঁর নাম উধাও। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল—দুই দফায় বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আগামী ৪ মে ভোট গণনা হবে।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে চলতি মাসে নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) মাধ্যমে ভোটার তালিকার হালনাগাদ করেছে। এটি একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়া, যা নিয়ে বিহার, আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর পরিচালনা করেছে।
নবীজানের স্বামী, তিন ছেলে, এক মেয়ে ও তাঁদের স্ত্রী-স্বামীরা সবাই চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেলেও তিনি পাননি। কারণ, এত দিন নবীজান ও তাঁর পরিবার খেয়াল করেনি, ভোটার কার্ডে তাঁর ডাকনাম ‘নবীজান’ ছিল। কিন্তু আধার কার্ড ও রেশন কার্ডের মতো অন্যান্য সরকারি নথিতে তাঁর নাম ‘নবীরুল’।
এই এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে নবীজানের মতো ৯২ লাখের বেশি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন, যা রাজ্যের মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই ৯২ লাখের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে ‘অনুপস্থিত’ বা ‘মৃত’ ঘোষণা করা হয়েছে। বাকি ৩০ লাখ ভোটার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাঁদের মামলার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ভোট দিতে পারবেন না।
বিধানসভা ভোটের আগে এত বিপুলসংখ্যক মামলার শুনানি প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়া ভোটাধিকার প্রমাণে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করে ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, যাঁদের মামলা ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে, তাঁদের এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আদালত নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচনের আগে সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের অনুমতি দিতে পারেন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার গোবিন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা নবীজান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এবার আমার পুরো পরিবার ভোট দেবে, কিন্তু আমি পারব না। আমি এসব খুব একটা বুঝি না। জানতাম না যে নামে ভুল থাকলে ভোট দেওয়া যাবে না।’
‘আমি গভীর যন্ত্রণায় আছি’
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম বাস করেন, যা রাজ্যের মোট ১০ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। উত্তর প্রদেশের পর পশ্চিমবঙ্গেই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে।
বিজেপি এই রাজ্যে কখনো ক্ষমতায় আসতে পারেনি। টানা ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) ক্ষমতায় আসে। তখন থেকে তারা রাজ্য শাসন করছে। ৭১ বছর বয়সী মমতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
সবর ইনস্টিটিউট দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেছে। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে ভবানীপুরে ২০ শতাংশ মুসলিম থাকলেও বাদ পড়াদের ৪০ শতাংশই মুসলিম।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমরা এই এসআইআর প্রক্রিয়ায় অসমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং যারা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে, সেখানেই নাম কাটার হার বেশি। যেমন মুর্শিদাবাদে ৪ লাখ ৬০ হাজার, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার এবং মালদহে ২ লাখ ৪০ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
আল-জাজিরা উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবিন্দপুর, গোবরা ও বালকি গ্রামের ডজনখানেক মুসলিম পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, সব নথি ঠিক থাকা সত্ত্বেও অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে বাসস্থানের প্রমাণ, বিয়ের পর পদবি পরিবর্তন, নামের বানানে ভুল বা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের প্রমাণ দেখাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নবীজানের মতো মুর্শিদাবাদের সাগরপাড়া গ্রামের ৪৯ বছর বয়সী সহিদুল ইসলামও আগে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি আর ভোটার নন। সহিদুল বলেন, ‘আমি গভীর যন্ত্রণায় আছি। কার কাছে যাব? কখনো ভাবিনি তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে। এখন আমার প্রধান লক্ষ্য নাম আবার অন্তর্ভুক্ত করা। টাকা আর সময় নষ্ট হলেও আমাকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।’
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে, এসআইআর প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হলো ভুয়া বা মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং বাদ পড়া প্রকৃত ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু এই প্রক্রিয়া ব্যাপক বিতর্ক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিরোধী দল ও মুসলিম সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, যারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপিকে ভোট দেবে না, বিশেষ করে মুসলিমদের পরিকল্পিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দিতে এই কাজ করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা বিমল শঙ্কর নন্দ আল-জাজিরাকে বলেন, কোনো যোগ্য ভারতীয় নাগরিক যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন, তবে অযোগ্য ভোটারও তালিকায় থাকা উচিত নয়। তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘মৃত ও এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ভোটারদের’ নাম তালিকায় রাখার অভিযোগ তোলেন। তিনি আরও দাবি করেন, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য পরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়া হচ্ছে।
তড়িঘড়ি তালিকা সংশোধনের পেছনে ‘উদ্দেশ্য’
২০১৪ সাল থেকে ভারতের মুসলিমরা মূলত সেই দল বা জোটকে ভোট দিচ্ছে, যারা বিজেপিকে হারাতে সক্ষম। পশ্চিমবঙ্গে সেই শক্তি হলো তৃণমূল কংগ্রেস। এ কারণেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছিলেন।
মমতা এক নির্বাচনী জনসভায় বলেন, ‘বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে পশ্চিমবঙ্গে বেছে বেছে এসআইআর প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। বিজেপি গণতান্ত্রিকভাবে জেতার সাহস রাখে না। তাই জালিয়াতির মাধ্যমে ভোট দখল করার ষড়যন্ত্র করছে।’
অন্যদিকে বিজেপি দাবি করছে, পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’-কে (যাঁদের তারা প্রায়ই ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ বলে সম্বোধন করে) চিহ্নিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে।
সাবির বলেন, ‘এই তড়িঘড়ির পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়। এই অঞ্চল বা এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান নেই, এমন পর্যবেক্ষকদের অন্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং মাঝরাতে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।’
‘এই তড়িঘড়ির পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়। এই অঞ্চল বা এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান নেই, এমন পর্যবেক্ষকদের অন্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং মাঝরাতে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।’
সবর ইনস্টিটিউট দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেছে। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে ভবানীপুরে ২০ শতাংশ মুসলিম থাকলেও বাদ পড়াদের ৪০ শতাংশই মুসলিম।
সাবির আহমেদ বলেন, ‘মুসলিমদের নাম সবচেয়ে বেশি ম্যাপ করা হয়েছে। উর্দু বা আরবি শব্দ বাংলা বা ইংরেজিতে অনুবাদের সময় যে ভুল হয়, সেগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলের মাধ্যমে “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি” বা যুক্তিহীন অসংগতি হিসেবে দেখিয়ে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।’
নারী ভোটারদের ওপর ‘অতিরিক্ত বোঝা’
বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক স্বাতী নারায়ণ আল-জাজিরাকে বলেন, নারী ও দরিদ্র মানুষ ভোটাধিকার হারানোর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ, তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিপত্রের অভাব থাকে।
স্বাতী নারায়ণ বলেন, ‘বিয়ের পর নারীরা বাড়ি পরিবর্তন করেন। পশ্চিমবঙ্গে ডাকনামের ব্যবহার খুব সাধারণ, যা অনেক সময় দাপ্তরিক নথিতে ঢুকে পড়ে। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে ও পরে ভিন্ন পদবি থাকে। এসব অসংগতির কারণে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’
৩১ বছর বয়সী জেসমিনা খাতুন বলেন, তাঁর সব কাগজ ঠিক আছে। বাবা ও দাদার নামও ২০০২ সালের তালিকায় ছিল। কিন্তু একটি ছোট সমস্যা হলো—স্কুল সনদে তাঁর বাবার নাম ‘গফর মণ্ডল’। কিন্তু অন্য নথিতে ‘গফফার মণ্ডল’। তাঁর বাবার নাম তালিকায় থাকলেও জেসমিনার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব আল-জাজিরাকে বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নারী ভোটারদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। পুরুষেরা যেখানে বাস করেন, সেখানকার কাগজপত্র দিলেই চলে। কিন্তু নারীদের তাঁদের পৈতৃক ভিটার কাগজ জোগাড় করতে হয়। এ ছাড়া বিয়ের পর প্রথম নাম বদলে ফেলার ভারতীয় রীতিকেও এখন আইনের চোখে ‘অপরাধ’ বা ‘জালিয়াতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যাদব বলেন, ‘সমস্যাটা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এমন নথি চাইছে, যা সে কখনো মানুষকে দেয়নি। একজন সাধারণ মানুষ যার হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাঁর কাছে একই বানানে সব জায়গায় নাম থাকার প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। রাষ্ট্র নিজেই বিভিন্ন জায়গায় মানুষের নাম ভিন্ন ভিন্নভাবে লিখেছে বা লিখছে।’
মুর্শিদাবাদের সহিদুল ইসলাম জানান, তিনি দুবার শুনানিতে উপস্থিত হয়ে সব নথি জমা দেওয়ার পরও তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি আবেগের সঙ্গে বলেন, ‘জানেন, কষ্টের কথা কী? এই মাটি খুঁড়লে আমাদের নাড়িপোঁতা পাওয়া যাবে। আমি একজন মুসলিম...আমরা এখানেই ভোট দেব, আর এখানেই মরব।’
সাবির বলেন, ‘এই তড়িঘড়ির পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয়। এই অঞ্চল বা এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান নেই, এমন পর্যবেক্ষকদের অন্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব ছিল এবং মাঝরাতে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।’
সবর ইনস্টিটিউট দুটি গুরুত্বপূর্ণ আসন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরের ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করেছে। নন্দীগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২৫ শতাংশ হলেও বাদ পড়া নামের ৯৫ শতাংশই মুসলিম। একইভাবে ভবানীপুরে ২০ শতাংশ মুসলিম থাকলেও বাদ পড়াদের ৪০ শতাংশই মুসলিম।
সাবির আহমেদ বলেন, ‘মুসলিমদের নাম সবচেয়ে বেশি ম্যাপ করা হয়েছে। উর্দু বা আরবি শব্দ বাংলা বা ইংরেজিতে অনুবাদের সময় যে ভুল হয়, সেগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলের মাধ্যমে “লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি” বা যুক্তিহীন অসংগতি হিসেবে দেখিয়ে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে।’
নারী ভোটারদের ওপর ‘অতিরিক্ত বোঝা’
বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ল স্কুল অব ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক স্বাতী নারায়ণ আল-জাজিরাকে বলেন, নারী ও দরিদ্র মানুষ ভোটাধিকার হারানোর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ, তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিপত্রের অভাব থাকে।
স্বাতী নারায়ণ বলেন, ‘বিয়ের পর নারীরা বাড়ি পরিবর্তন করেন। পশ্চিমবঙ্গে ডাকনামের ব্যবহার খুব সাধারণ, যা অনেক সময় দাপ্তরিক নথিতে ঢুকে পড়ে। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের আগে ও পরে ভিন্ন পদবি থাকে। এসব অসংগতির কারণে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।’
৩১ বছর বয়সী জেসমিনা খাতুন বলেন, তাঁর সব কাগজ ঠিক আছে। বাবা ও দাদার নামও ২০০২ সালের তালিকায় ছিল। কিন্তু একটি ছোট সমস্যা হলো—স্কুল সনদে তাঁর বাবার নাম ‘গফর মণ্ডল’। কিন্তু অন্য নথিতে ‘গফফার মণ্ডল’। তাঁর বাবার নাম তালিকায় থাকলেও জেসমিনার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব আল-জাজিরাকে বলেন, এসআইআর প্রক্রিয়া নারী ভোটারদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। পুরুষেরা যেখানে বাস করেন, সেখানকার কাগজপত্র দিলেই চলে। কিন্তু নারীদের তাঁদের পৈতৃক ভিটার কাগজ জোগাড় করতে হয়। এ ছাড়া বিয়ের পর প্রথম নাম বদলে ফেলার ভারতীয় রীতিকেও এখন আইনের চোখে ‘অপরাধ’ বা ‘জালিয়াতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যাদব বলেন, ‘সমস্যাটা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র এমন নথি চাইছে, যা সে কখনো মানুষকে দেয়নি। একজন সাধারণ মানুষ যার হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাঁর কাছে একই বানানে সব জায়গায় নাম থাকার প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। রাষ্ট্র নিজেই বিভিন্ন জায়গায় মানুষের নাম ভিন্ন ভিন্নভাবে লিখেছে বা লিখছে।’
মুর্শিদাবাদের সহিদুল ইসলাম জানান, তিনি দুবার শুনানিতে উপস্থিত হয়ে সব নথি জমা দেওয়ার পরও তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি আবেগের সঙ্গে বলেন, ‘জানেন, কষ্টের কথা কী? এই মাটি খুঁড়লে আমাদের নাড়িপোঁতা পাওয়া যাবে। আমি একজন মুসলিম...আমরা এখানেই ভোট দেব, আর এখানেই মরব।’