ছাত্রের আত্মহত্যার পর আইআইটি বম্বের ছাত্রাবাসের সিলিং ফ্যান খুলে লাগানো হচ্ছে ওয়াল ফ্যান
সাহিল ওয়াকোডের আত্মহত্যার পর আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ সোয়া শ বছর আগে লেখা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটি মনে করিয়ে দিল।
হবু রাজের হুকুম ছিল পৃথিবীর ধুলা ঢাকার উপায় বাতলানোর, কেননা রাস্তার ধুলামাটি তাঁকে মলিন করে দেয়। মন্ত্রী গোবুসহ পাত্র মিত্র ভৃত্য ও পণ্ডিতকুল ধরণির ধুলা ঝাঁট দিতে গিয়ে বিপত্তি আরও বাড়ালেন। সেই ধুলা ধুতে নিঃশেষ হলো পুকুর ও দিঘির জল। শেষে চামারকে বলা হলো চামড়া দিয়ে রাজ্য ঢাকতে। বৃদ্ধ চামার কুলপতিই উপায় বাতলান। চামড়ার জুতায় ঢাকা হলো হবু রাজার চরণযুগল।
সাহিল ওয়াকোডের আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানের মূলে না গিয়ে আইআইটি বম্বে কর্তৃপক্ষ ছাত্রাবাস থেকে সিলিং ফ্যান খুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার বদলে লাগানো হচ্ছে ওয়াল ফ্যান বা দেয়াল পাখা। আত্মহত্যার সহজ উপায় হিসেবে সিলিং ফ্যানে ফাঁস লাগিয়ে ২২ বছরের সাহিল ঝুলে পড়েছিলেন। দেয়াল পাখা থেকে ফাঁস লাগিয়ে ঝোলা কঠিন।
গাদা গাদা ওয়াল ফ্যান বা দেয়াল পাখা চলে এসেছে বম্বে আইআইটির ছাত্রাবাসগুলোতে। শুরু হচ্ছে লাগানোর কাজ। যদিও প্রশ্ন উঠেছে, এভাবে পড়ুয়াদের আত্মহননের পথ বন্ধ করা যায় কি?
মহারাষ্ট্রের ইয়াবতমাল জেলার বাসিন্দা সাহিল ছিলেন আইআইটি বম্বের এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত শুক্রবার মিড–সেমিস্টার পরীক্ষা চলাকালে তাঁকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগ, পরীক্ষার সময় সাহিল ফোনে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করছিলেন। খানিক পর ছাত্রাবাসের সিলিং ফ্যান থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়।
সাহিলের মা–বাবার অভিযোগ, পরীক্ষায় নকল ধরা পড়ার পর তাঁদের ছেলেকে জাতিগত বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। দলিত বলে সাহিলকে বিশ্রী ভাষায় অপমান করা হয়। ওই জাতিগত অপমানই সাহিলের মৃত্যুর কারণ।
এরপরই শুরু হয় ছাত্র বিক্ষোভ। পড়ুয়াদের পাশাপাশি বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন রাজনৈতিক কর্মীরাও। বিক্ষোভকারীদের দাবির মুখে আইআইটি কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে গতকাল সোমবার প্রশাসনিক পদ থেকে সরিয়ে দেয়। অধ্যাপক দুল্লা ছিলেন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাফেয়ার্সের ডিন। বিক্ষোভকারীরা ওই অপসারণে সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি, নির্দোষ প্রতিপন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে বরখাস্ত করতে হবে।
অধ্যাপক দুল্লার সমর্থনে দাঁড়িয়েছেন আইআইটি বম্বের ফ্যাকাল্টি ফোরাম। দুল্লার সমর্থনে তাঁরা ক্যাম্পাসে মিছিল করেছেন। তাঁরা ওই ঘটনার সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। আইআইটি মাদ্রাজের ফ্যাকাল্টি অ্যাসোসিয়েশনও অধ্যাপক দুল্লার সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছে। সাহিলের পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোর্স প্রশিক্ষক এবং পরিদর্শক হিসেবে অধ্যাপক দুল্লা প্রতিষ্ঠানের সিনেট অনুমোদিত একাডেমিক পদ্ধতি অনুসারেই কাজ করেছেন।
সাহিলের আত্মহত্যার পর তাঁর পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অধ্যাপক দুল্লার বিরুদ্ধে তফসিল জাতি ও তফসিল উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনে মামলা দায়ের করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৮ নম্বর ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগও আনা হয়েছে।
ভারতে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মহননের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের সময় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া ও পরীক্ষা বাতিলের পর হতাশার দরুন ২৩ পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিলেন। সর্বস্তরে এই হতাশা বৃদ্ধি বন্ধ করতে সিজেপি গোটা পরীক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল। হতাশা ও অপমানের জ্বালা সাহিলের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকলেও অন্যান্য নানা কারণেও আইআইটি পড়ুয়ারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন।
গ্লোবাল আইআইটি অ্যালুমনি সাপোর্ট গ্রুপের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছর ভারতের আইআইটিগুলোয় ৬৯ জন পড়ুয়া আত্মহত্যা করেছেন। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আইআইটি কানপুরে। মোট আত্মহননের ৩০ শতাংশ ওই প্রতিষ্ঠানে। পড়াশোনা ও কর্মজীবন নিয়ে তীব্র মানসিক চাপ, সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্য, অকার্যকর হয়ে পড়ার শঙ্কা ও একাকিত্বের হতাশা আত্মহননের প্রধান কারণ বলে মনে করা হয়।
পড়ুয়াদের চাপ কমানো ও তাঁদের মানসিক সুস্থতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন এনসিপি (শারদ পাওয়ার) দলের নেতা অনীশ গাওয়ান্ডে। সাহিলের মৃত্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ছাত্রাবাসে সিলিং ফ্যানের বদলে দেয়াল পাখা লাগানো সমস্যার সুরাহা হতে পারে না। এই হাস্যকর পরিকাঠামোগত বদলের রাস্তায় না হেঁটে আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠানের উচিত পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া। নইলে সিলিং ফ্যান থেকে না ঝুলে পড়ুয়ারা আত্মহত্যার অন্য উপায় খুঁজে নেবে।