দীপক কুমারের জিমে ছিল ১৫০ গ্রাহক, ‘মোহাম্মদ দীপক’ নাম শোনার পর থাকলেন ১৫ জন

দীপক কুমারছবি: দীপক কুমারের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট

ভারতের উত্তরাখন্ডের কোটদ্বারে বদ্রিনাথ রোডের পাশে ‘হাল্ক’ নামের জিমটি। একসময় এ জিম ছিল ভীষণ ব্যস্ততাপূর্ণ। প্রতিদিন ১৫০ জন সদস্য শরীরচর্চা করতেন। এখন সেখানে সদস্য কমে মাত্র ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

জিমের মালিক দীপক কুমার। সম্প্রতি উচ্ছৃঙ্খল জনতার (উগ্র হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের কর্মী-সমর্থক) হামলা থেকে ৭০ বছর বয়সী একজন মুসলিম দোকানিকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি ব্যাপক বিদ্বেষের মুখে পড়েন। তাঁদের কাছে নিজেকে ‘মোহাম্মদ দীপক’ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। এর পর থেকে গ্রাহক বর্জনের মুখে পড়েছেন দীপক।

গ্রাহকদের বেশির ভাগই দীপকের জিমে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি। জিমের ফ্লোর ভাড়ার জন্য প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা দিতে হয় তাঁকে। সঙ্গে রয়েছে বাড়ির ঋণের কিস্তি—আরও ১৬ হাজার টাকা।

সদস্য কমে যাওয়ায় প্রায় বন্ধের পথে দীপকের জিম। ফলে সংসারের ন্যূনতম খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন পরিবারের প্রধান ভরসা, তাঁর ৭০ বছর বয়সী মায়ের ছোট্ট চা-দোকান। সেই আয়েই নির্ভর করে কোনোভাবে চলছে সংসার।

বিতর্কের মূলে

ঘটনার শুরু গত ২৬ জানুয়ারি। সেদিন ‘বাবা স্কুল ড্রেস’ নামের একটি দোকানে উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা হয়। দোকানের মালিক ভাকিল আহমেদ। দোকানের নামে ‘বাবা’ থাকা নিয়ে আপত্তি ছিল এই জনতার। তাদের দাবি, নামটি স্থানীয় সিদ্ধবালি বাবা মন্দিরের নামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তবে স্থানীয়দের অনেকেই বলেছেন, আশপাশের আরও অনেক দোকানের নামেই ‘বাবা’ শব্দ ব্যবহার করা হয় এবং সেগুলো নিয়ে কখনো আপত্তি তোলা হয়নি। এতে অভিযোগ উঠেছে, আহমেদকে শুধু তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিশানা বানানো হয়েছে।

জিমের সদস্য কমে যাওয়ায় আয় প্রায় বন্ধের পথে দীপকের। ফলে সংসারের ন্যূনতম খরচ চালাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন পরিবারের প্রধান ভরসা, তাঁর ৭০ বছর বয়সী মায়ের ছোট্ট চা-দোকান। সেই আয়েই নির্ভর করে কোনোভাবে চলছে সংসার।

‘বাবা স্কুল ড্রেস’-এর বয়স্ক দোকানিকে বাঁচাতে দীপক এগিয়ে যান। তখন ওই জনতা তাঁর নাম জানতে চায়। জবাবে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমার নাম মোহাম্মদ দীপক।’

পরে এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দীপক তাঁর নাম কেন ‘মোহাম্মদ দীপক’ বলেছিলেন, সেটির ব্যাখ্যা দেন।

দীপক কুমার বলেন, ‘আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি হিন্দু, মুসলিম, শিখ কিংবা খ্রিষ্টান নই।’ তিনি আরও বলেন, বজরং দলের কিছু সদস্য যখন তাঁকে জেরা করছিলেন এবং নাম জানতে চাইছিলেন, তখন না ভেবেচিন্তেই নামটি উচ্চারণ করেন।

দীপক বলেন, তিনি এ বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন যে তিনি একজন ভারতীয় এবং কোনো নিশানায় না পড়ে প্রত্যেকেরই এ দেশে বসবাস করার অধিকার আছে।

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া

দীপকের এ পদক্ষেপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোড়ন তোলে। অনেকে তাঁকে ‘বীর’ বলে আখ্যা দেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি অনলাইনে ভীষণ রকমের বিদ্বেষ ও কটূক্তির মুখে পড়েন। কিছু গণমাধ্যমও তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার চালাচ্ছে।

দীপকের দাবি, এ পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি তাঁর ব্যবসায় পড়েছে। স্থানীয় অনেক পরিবার এখন ভয়ে (উচ্ছৃঙ্খল জনতার ভয়ে) তাদের সন্তানদের জিমে পাঠাতে চাইছে না। এতে জিমের সদস্যসংখ্যা আরও কমেছে।

গত সপ্তাহে সিপিআইয়ের (এম) রাজ্যসভার সদস্য জন ব্রিটাস কোটদ্বারে গিয়ে দীপকের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। তিনি দীপকের সঙ্গে রাস্তায় হেঁটেছেন এবং প্রতীকীভাবে তাঁর জিমের সদস্যপদ গ্রহণ করেছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও তাঁকে ‘ভারতের নায়ক’ উল্লেখ করে প্রশংসা করেছেন।

এদিকে উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি এ ঘটনায় বিরোধী দলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন।

আরও পড়ুন