কুতুব মিনার চত্বরের লৌহস্তম্ভে ১৬০০ বছরেও মরিচা ধরেনি, কী কারণে এমন অক্ষত
লোহার তৈরি কোনো বস্তু খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর থাকলে তাতে মরিচা ধরবে—এটাই স্বাভাবিক। বৃষ্টি, বাতাসের আর্দ্রতা ও অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে লোহা। কিন্তু ভারতের রাজধানী দিল্লির কুতুব মিনার চত্বরে মিনারের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি লৌহস্তম্ভ যেন প্রকৃতির এই চিরচেনা নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে অবস্থিত প্রায় ৭ দশমিক ২ মিটার উঁচু এই লৌহস্তম্ভ প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত দীর্ঘ সময় ধরে খোলা পরিবেশে থাকার পরও এতে কোনো মরিচা ধরেনি। আজও এটি দেখতে অনেকটাই নতুন ও মজবুত।
সাধারণত বাতাসের অক্সিজেন ও আর্দ্রতার প্রভাবে লোহায় মরিচা ধরে। ধীরে ধীরে লোহার গায়ে লালচে-বাদামি রঙের একটি স্তর জমতে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষয় বাড়ে এবং ধাতব কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। বৃষ্টি ও আর্দ্র পরিবেশে থাকলে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ঘটে।
কিন্তু দিল্লির এই লৌহস্তম্ভ কীভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মরিচামুক্ত রইল?
সিএনএনের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ভারতের আইআইটি কানপুরের একদল গবেষক এই রহস্যের সমাধান করেন।
তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ ধরনের পেটানো লোহা দিয়ে। আধুনিক লোহার তুলনায় এতে ফসফরাসের পরিমাণ অনেক বেশি ছিল। অন্যদিকে সালফার ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো উপাদান ছিল খুবই কম।
গবেষকেরা আরও বলেন, প্রাচীন ভারতীয় কারিগরেরা স্তম্ভটি তৈরিতে ‘ফোর্জ ওয়েল্ডিং’ নামে একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন। এই পদ্ধতিতে লোহাকে বারবার আগুনে গরম করে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়। এর ফলে লোহার মধ্যে ফসফরাসের মাত্রা উচ্চ অবস্থায় বজায় থাকে।
এ ছাড়া স্তম্ভটির গায়ে ‘মিসাওয়াইট’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ যৌগের স্তর তৈরি হয়েছে বলে গবেষণায় দেখা যায়। লোহা, অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সমন্বয়ে গঠিত এই যৌগ ধাতুর ওপর একটি সুরক্ষাবলয় তৈরি করে।
উচ্চ মাত্রার ফসফরাস এবং চুনের অনুপস্থিতিতে এই স্তর তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি স্তম্ভটিকে বৃষ্টি, রোদ ও আবহাওয়ার নানা প্রতিকূল প্রভাব থেকে রক্ষা করেছে।
গবেষকদের মতে, লৌহস্তম্ভটির মরিচা প্রতিরোধের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এতে থাকা উচ্চ মাত্রার ফসফরাস। ধাতুর অন্যান্য গঠনগত বৈশিষ্ট্য বা উপাদানের তুলনায় এটিই স্তম্ভটিকে ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছে।
কুতুব মিনারে লৌহস্তম্ভ এল কীভাবে
বর্তমানে লৌহস্তম্ভটি কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের অংশ হলেও এটি মূলত সেখানে নির্মিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে দিল্লি সালতানাতের শাসক শামসুদ্দিন ইলতুতমিশের আমলে স্তম্ভটি কুওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ এবং বৃহত্তর কুতুব কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ধারণা করা হয়, বিজয় ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে এটি সেখানে স্থাপন করা হয়েছিল।
স্তম্ভে খোদাই করা একটি শিলালিপিতে রাজা চন্দ্রের নাম উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্তম্ভটি ‘বিষ্ণুপদগিরি’ নামের একটি স্থানে স্থাপন করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ গবেষক জে এফ ফ্লিট মনে করতেন, বিষ্ণুপদগিরি বলতে মথুরাকে বোঝানো হয়েছে। দিল্লির কাছাকাছি অবস্থান এবং তীর্থস্থান হিসেবে মথুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাঁর এই ধারণার ভিত্তি।
অন্যদিকে গবেষক মীরা দাস ও আর বালাসুব্রামানিয়ানের মতে, লৌহস্তম্ভটি মূলত মধ্যপ্রদেশের উদয়গিরি গুহা এলাকায় স্থাপন করা হয়েছিল। তাঁদের ধারণা, শিলালিপিতে উল্লেখ করা ‘বিষ্ণুপদগিরি’ নামটি আসলে উদয়গিরিকেই নির্দেশ করে।
তবে স্তম্ভটি ঠিক কখন, কীভাবে এবং কার উদ্যোগে দিল্লিতে আনা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো কোনো সর্বসম্মত মত পাওয়া যায়নি।
একটি বহুল প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, তোমর রাজবংশের শাসক অনঙ্গপাল তোমর লৌহস্তম্ভটি দিল্লিতে নিয়ে আসেন।
তবে ২০০৯ সালে গবেষক ফিনবার ব্যারি ফ্লাড ভিন্ন একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, স্তম্ভটি প্রথমে বিদিশায় স্থাপন করা হয়েছিল। পরে ত্রয়োদশ শতকে বিদিশা দখলের পর সুলতান ইলতুতমিশ এটি সরিয়ে দিল্লির কুতুব কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন।
তবে এসব তত্ত্বের কোনোটি এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে দিল্লির এই লৌহস্তম্ভের আদি অবস্থান ও সেখানে পৌঁছানোর ইতিহাস আজও গবেষকদের কাছে এক রহস্য হয়ে রয়েছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। প্রায় ১ হাজার ৬০০ বছর ধরে রোদ, বৃষ্টি ও প্রকৃতির নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকা এই লৌহস্তম্ভ প্রাচীন ভারতীয় ধাতুবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। আর এ কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের বিস্মিত করে আসছে।