অনিশ্চয়তায় ভারতের উত্তর প্রদেশের ভোট
পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের ভাগ্য হঠাৎ প্রশ্নের মুখোমুখি। একদিকে অমিক্রনের ভ্রুকুটি, অন্যদিকে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতির নির্দেশ দেশের নির্বাচন কমিশনকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ভোটভাগ্য স্থির করতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুশীল চন্দ্র আগামীকাল সোমবার বৈঠক করবেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব রাজেশ ভূষণের সঙ্গে। তারপর কমিশন সদস্যরা যাবেন উত্তর প্রদেশে। তিন দিনের সফর শেষে ৩০ ডিসেম্বর দিল্লি ফিরে তাঁরা তাঁদের ইতিকর্তব্য ঠিক করবেন। তত দিন পর্যন্ত ঝুলে থাকছে অনিশ্চয়তার পর্দা।
কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালার মতো বড় রাজ্যে বিধানসভার ভোট। পশ্চিমবঙ্গের ভোট হয়েছিল আট পর্যায়ে। সে নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে পড়তে হয়েছিল প্রবল সমালোচনার মুখে। কেন জনসমাবেশ বন্ধ করা হয়নি, কেন রোড শোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি—এমন ধরনের কথা শুনতে হয়েছিল কমিশনকে। এবার আগেভাগেই এ ধরনের প্রশ্ন তুলে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শেখর যাদব।
গত শুক্রবার এক মামলার শুনানির সময় তিনি এই পরামর্শ দিয়ে বলেন, নবরূপী কোভিডের প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। পরিস্থিতির মোকাবিলায় নির্বাচনী জনসভা নিষিদ্ধ করা দরকার। উত্তর প্রদেশের ভোট পিছিয়ে দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও নির্বাচন কমিশনের ভাবনাচিন্তা করা দরকার। বিচারপতি তাঁর ওই অভিমত নির্বাচন কমিশনকে জানানোর নির্দেশও দেন।
হাইকোর্টের অভিমত জানা মাত্র নড়েচড়ে বসে নির্বাচন কমিশন। কালক্ষেপণ না করে নির্বাচন কমিশন অমিক্রনের প্রকোপ ও পাঁচ রাজ্যের ভোটের ওপর তার সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বুঝতে উদ্যোগী হয়। কমিশনের এক সূত্রের মতে, নাগরিক নিরাপত্তার বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের দরুন যে বিরূপ সমালোচনা শুনতে হয়েছে, তা যাতে না হয় সেই বিষয়ে কমিশন সতর্ক। সূত্রের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সব মহলের সঙ্গে কমিশন পরামর্শ করবে।
ভারতে অমিক্রনের প্রকোপ বাড়লেও এখনো বাড়াবাড়ির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদিও অমিক্রন সংক্রান্ত জরুরি বৈঠক শেষে তেমন কথা বলেছেন।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি উত্তর প্রদেশের ভোট গ্রহণ পিছিয়ে দেওয়ার কথা বললেও কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে পাঁচ রাজ্য সম্পর্কে। ভোটের প্রচার নিয়ে বেশ কিছু নির্দেশিকা কমিশন আগেই দিয়েছে। মুশকিল হলো, সেসব কোনো দল আগেও মানেনি, এখনো মানছে না। পশ্চিমবঙ্গে এমনই হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিলেন জনসভাগুলোয়। উত্তর প্রদেশেও এখন তা-ই ঘটছে। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণার আগে মোদি বারবার ওই রাজ্যে যাচ্ছেন বিবিধ প্রকল্প ঘোষণা করতে। তাঁর জনসভায় বিপুল মানুষ জড়ো হচ্ছেন। বিরোধী নেতাদের জনসভাও সমানে পাল্লা দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে সংক্রমণের আশঙ্কা। কমিশন এখন কী করবে, সেই জল্পনা বেড়ে গেছে।
আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে নতুন বিধানসভা গড়তে হবে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড, গোয়া ও মণিপুরে। বছর শেষে ভোট হওয়ার কথা হিমাচল প্রদেশ ও গুজরাটে। সাত রাজ্যের মধ্যে পাঞ্জাব ছাড়া প্রতিটিতেই বিজেপি ক্ষমতাসীন।
উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড ও গোয়ায় শাসক দল রয়েছে প্রবল চাপে। তিন রাজ্যেই কৃষক আন্দোলনে বিজেপি কোণঠাসা। বিরোধী শক্তিও জোরদার। এই অবস্থায় শাসক দলের একাংশ মনে করছে, ভোট কিছুদিন পিছিয়ে গেলে বিজেপি ঘর গোছানোর বাড়তি সময় পাবে। বিজেপির বিক্ষুব্ধ নেতা সুব্রামানিয়াম স্বামী ইতিমধ্যে টুইট করে বলেছেন, উত্তর প্রদেশের মানুষ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের ওপর ক্ষিপ্ত। সেখানে ভোট পেছানোর অর্থ রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হওয়া। তাতে বিজেপির লাভ বই ক্ষতি নেই। উত্তর প্রদেশে ভোট পিছোলে তিনি তাই অবাক হবেন না।
বিচারপতি শেখর যাদবের পরামর্শ কতটা ‘রাজনৈতিক’, শুরু হয়েছে সেই চর্চাও। বিভিন্ন মামলার শুনানির সময় তিনি ইদানীং এমন মন্তব্য করেছেন, যা জনজীবনে যথেষ্ট আলোচিত। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে গোহত্যাসংক্রান্ত এক মামলায় তিনি বলেছিলেন, ‘গরুকে জাতীয় প্রাণী ঘোষণা করা উচিত। গোরক্ষা হিন্দুদের মৌলিক অধিকার।’ পরের মাসে তাঁর পরামর্শ ছিল, রাম, কৃষ্ণ, রামায়ণ, গীতা, ঋষি বাল্মীকি ও বেদব্যাসকে জাতীয় মর্যাদায় ভূষিত করে হেরিটেজের আওতায় আনা দরকার। বলেছিলেন, রাম ছাড়া ভারত অসম্পূর্ণ। ভারতের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য স্কুলে অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। ধর্মান্তরকরণ-সংক্রান্ত বিষয়েও তিনি কিছু মন্তব্য করেছিলেন, যা নিয়ে ‘উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা’ সরব।
উত্তর প্রদেশে কোণঠাসা হিন্দুত্ববাদীদের রক্ষার জন্য বিচারপতির এই পরামর্শ কি না, রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসছে সেই প্রসঙ্গও।