তালিকায় নাম না থাকলে 'নিজ দেশে' ফেরত

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তৈরি নিয়ে যে সুর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, বৈঠকের পর সেই সুরেরই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে দলের অন্য শীর্ষ নেতাদের কথায়। যেমন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব পরবর্তী ইতিকর্তব্যগুলো নির্দিষ্ট করে জানিয়েছেন, চূড়ান্ত তালিকায় যাঁদের নাম থাকবে না, প্রথমে তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। তারপর তাঁদের ‘নিজ দেশে’ ফেরত পাঠানো হবে। 

রাম মাধবের কথায়, বিদেশি বাছাই করা হচ্ছে প্রথম কাজ। দ্বিতীয় কাজ নাগরিক নিবন্ধন তৈরি করা। তৃতীয় কাজ, যাঁরা নাগরিক নন, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া। চতুর্থ কাজ, সব ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে তাঁদের বঞ্চিত করা। পঞ্চম কাজ, যে দেশ থেকে তাঁরা এসেছেন, সেখানে তাঁদের ফেরত পাঠানো। রাম মাধব বলেন, ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তির শর্ত অনুযায়ীই এনআরসি তৈরি করা হচ্ছে এবং তা করা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে।
দলের কর্মসমিতির বৈঠকে এনআরসি নিয়ে চড়া সুর বেঁধে দিয়েছিলেন দলীয় সভাপতি অমিত শাহ নিজেই। শুধু আসামেই নয়, অন্য রাজ্যেও যে এনআরসি তৈরি করা দরকার, সেই প্রয়োজনীয়তার কথাও শুনিয়েছিলেন। বিদেশি বাছাই করে তাঁদের ফেরত পাঠানোর কথা বলার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে অত্যাচারিত অমুসলমানদের নাগরিকত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের ওপরও জোর দিয়েছিলেন। সেই কথার ঠিক পরের দিন গত সোমবার এক আলোচনা সভায় রাম মাধব যা বললেন, তাতে পরিষ্কার, এনআরসির মাধ্যমে বিদেশি বাছাইয়ের বিষয়টিকে বিজেপি ভোটের আগে নতুন করে রাজনৈতিক বিষয় করে তুলতে আগ্রহী। আগ্রহের কারণ একটাই, ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটে জেতা।
শুধু রাম মাধবই নন, একই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজ্যে এনআরসি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা শুনিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে তাঁর নাম করে প্রশংসা করেছিলেন অমিত শাহ। উজ্জীবিত সর্বানন্দ বলেন, আসামে যাঁরা বিদেশি বলে চিহ্নিত হবেন, তাঁরা অন্য রাজ্যে চলে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে বিদেশি বাছাইয়ের মূল লক্ষ্যই বিফলে যাবে। এই কারণে সব রাজ্যেই এনআরসি তৈরি করা দরকার। সর্বানন্দ আরও বলেন, বিদেশি বিতাড়ন হলে প্রকৃত নাগরিকদের আরও অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা সরকার দিতে পারবে। রাম মাধব বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশই অবৈধভাবে চলে আসা মানুষদের আশ্রয় দেয় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভারত একটা বিশাল ধর্মশালা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনআরসিতে নাম না থাকা মানুষজনকে ফেরত পাঠানোর যে কথা অমিত শাহ বা রাম মাধব বলছেন, বিজেপির কোনো মন্ত্রী কিন্তু সে কথা বলছেন না। জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং অথবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কেউই চিহ্নিত বিদেশিদের ফেরত পাঠানো বিষয়ে একটাও মন্তব্য করেননি। ফেরত পাঠানো বিষয়ে যা কিছু বলা হচ্ছে, তা পার্টি বা দলের পক্ষ থেকে। সর্বানন্দ সোনোয়াল অথবা অন্য মন্ত্রীরা যা বলছেন, তা অন্য রাজ্যেও এনআরসি তৈরির প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত। স্পষ্টতই, ‘বিদেশিদের’ ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বিজেপি দল ও সরকারের অবস্থান ভিন্ন।
চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আসাম এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে। ৩০ জুলাই প্রকাশিত দ্বিতীয় খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছে ৪০ লাখের বেশি নাগরিকের নাম। চূড়ান্তভাবে যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের কী করা হবে, সে বিষয়ে রাজ্য বা কেন্দ্রীয় কোনো সরকারই এখনো কিছু বলেনি। বিজেপির দাবি, অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশি। ফেরত পাঠাতে গেলে তাঁদের তাই বাংলাদেশেই ফেরত পাঠাতে হয়। বাংলাদেশ ওই দাবি স্বীকার করে না। তাদের কাছে এনআরসির সমস্যা ভারতের অভ্যন্তরীণ। বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করারও কারণ নেই। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা যথেষ্ট উন্নত। তা ছাড়া, এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো কোনো আলোচনাও করেনি।