প্রায় ১৭ বছর ধরে নিঃসঙ্গ শংকর
২৬ বছর বয়সে প্রায় ১৭ বছর ধরে কাটছে নিঃসঙ্গ। নিজের দেশ ও পরিবেশ ছেড়ে দুই বছর বয়সে পাঠানো হয় ভিনদেশে। সঙ্গে ছিল আরেক সদস্য। ওই সঙ্গীর সঙ্গে ধীরে ধীরে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। কিন্তু সঙ্গীটি আচমকা মরে যায়। এরপর থেকে নিঃসঙ্গ জীবন বয়ে বেড়াচ্ছে শংকর।
শংকর একটি হাতি। ২৪ বছর আগে শাবক অবস্থায় এটিকে আফ্রিকা থেকে উড়োজাহাজে করে ভারতে আনা হয়েছিল। রাখা হয় দিল্লির চিড়িয়াখানায়। শংকর ও বোম্বাই নামের দুটি হাতিকে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শংকর দয়াল শর্মাকে উপহার দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে সরকার।
এখন আফ্রিকান ওই হাতি নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে দিল্লির হাইকোর্টে আবেদন করেছে ‘ইয়ুথ ফর অ্যানিমেল’ নামের বেসরকারি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা নিকিতা ধাওয়ান। এ নিয়ে বিবিসি এক প্রতিবেদন করেছে।
১৬ বছর বয়সী দিল্লির কিশোরী নিকিতা তার আবেদনে বলেছে, বছরের পর বছর শংকর নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছে। তাই হাতিটি চিড়িয়াখানা থেকে সরিয়ে অন্যান্য হাতির জন্য তৈরি বন্য প্রাণী অভয়াশ্রমে পুনর্বাসন করা দরকার। চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলোকে ঠিকঠাকভাবে দেখভাল করা হয় না বলেও অভিযোগ করা হয়। বিবিসির পক্ষ থেকে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
নিকিতার ভাষ্য, শংকরকে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে দেশটিতে বন্দী সব হাতির দুর্দশা বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে চায় সে। ‘ভারতীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী হাতিকে অনেক মর্যাদা দেওয়া হয়। এগুলো সব জায়গায় চোখে পড়ে। মন্দির থেকে শুরু করে ব্যক্তিমালিকানায়ও হাতির উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। ইতিহাসেও এই হাতির অবস্থান দেখা যায়। কিন্তু এখন আমরা হাতির যত্ন নিই না।’
২০০৯ সালে ভারতের সেন্ট্রাল জু অথরিটি চিড়িয়াখানায় হাতি প্রদর্শন নিষিদ্ধ করে এবং ৬ মাসের বেশি সময় কোনো হাতিকে একা না রাখার বিধান জারি করে।
ভারতে বৈরী পরিবেশে দীর্ঘ দিন থাকা বন্দী হাতিগুলোর সঙ্গে মানবিক আচরণ করার দাবি জানিয়ে আসছে প্রাণী অধিকার রক্ষার কর্মীরা। দেশটিতে ব্যক্তিমালিকানায় থাকা হাতির ধর্মীয় শোভাযাত্রা, মালপত্র টানার কাজে এমনকি ভিক্ষার কাজেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বর্তমানে শংকর ছাড়াও আফ্রিকান আরেকটি হাতি ভারতের চিড়িয়াখানায় আছে। সেটি কর্ণাটক রাজ্যের মাইসোর চিড়িয়াখানায় রয়েছে।
শংকর যে সব সময়ই একা ছিল, তেমনটা নয়। ১৯৯৮ সালে ভারতে আসার সময় এটির সঙ্গে বোম্বাই নামে আরেকটি হাতিও আসে। হাতি দুটির ছিল বিশাল আকৃতির পাখার মতো কান। এটিই ছিল হাতি দুটির বৈশিষ্ট্য, যা খুব সহজে এশিয়ার হাতি থেকে আলাদা করে। তবে আফ্রিকায় এই হাতির আদিবাস কোথায় তা চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলতে পারেনি।
কয়েক বছর ধরে শংকর ও বোম্বাইয়ের মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। কিন্তু ২০০৫ সালে আচমকা বোম্বাই মারা যায়। এরপর শংকর নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। গত সেপ্টেম্বরে নিকিতা চিড়িয়াখানায় গিয়ে দেখে, হাতিটি রাখা হয়েছে স্টিলের বেষ্টনীর মধ্যে অন্ধকারে। তখনই সে সিদ্ধান্ত নেয় শংকরের মুক্তির জন্য লড়বে সে। নিকিতা বলে, এর দুর্দশা আমাদের পীড়া দেয়। খুব বিষণ্ন ছিল হাতিটি।
এদিকে দিল্লির চিড়িয়াখানায় লক্ষ্মী ও হীরা নামের আরও দুটি এশিয়ান হাতি আছে। তবে এগুলোকে শংকরের কাছ থেকে আলাদা রাখা হয়। তাই সজাতির দেখা পাওয়া তো দূরের কথা গন্ধটুকুও নাকে আসে না শংকরের। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলেছে, শংকরের একাকিত্ব দূর করতে আরেকটি হাতি খোঁজা হচ্ছে।
ভারতের দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে চিড়িয়াখানার পরিচালক সোনালী ঘোষ জানান, শংকরের সঙ্গী হতে পারে এমন একটি হাতির খোঁজে আফ্রিকার বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। সঙ্গী না পাওয়া না গেলে শংকরকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।
চিড়িয়াখানার সাবেক পরিচালক রমেশ পান্ডে বলেন, তিনটি হাতিকে একসঙ্গে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর আচরণ ভিন্ন হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। প্রাণী অধিকার কর্মীদের ভাষ্য, এর কারণ শংকর অন্য পরিবেশের বাসিন্দা।
এ বিষয়ে ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল প্রোটেকশন অব ইন্ডিয়ার ওয়াইল্ডলাইফ প্রজেক্টসের ম্যানেজার শুভব্রত ঘোষ বলেন, শংকর ভিন্ন পরিবেশে একাকী অবস্থায় আছে। আফ্রিকার পুরুষ হাতি ‘সামাজিক বন্ধন’ গড়ে তুলতে বেশ দক্ষ। বন্য পরিবেশে হাতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং জীবনভর তা অটুট থাকে। কিন্তু চিড়িয়াখানায় সেই পরিবেশ দেওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ছোট বেষ্টনীর মধ্যে আটকে রাখলে এসব প্রাণীর ওপর মানসিক চাপ তৈরি হয়, এতে খ্যাপাটে আচরণ করতে পারে।
কয়েক বছর ধরে শংকরের এই দুর্দশা প্রাণী অধিকার কর্মী ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর নজর কাড়ে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যাসপিনাল ফাউন্ডেশনও রয়েছে। এই সংগঠন নিজেদের খরচে শংকরকে আফ্রিকায় জুতসই জায়গায় পুনর্বাসন করারও প্রস্তাব দেয়।
নিকিতা শংকরকে বন্য পরিবেশে যেখানে আফ্রিকান অন্য হাতি বসবাস করে, সেখানে ছেড়ে দেওয়ার দাবিতে অনলাইনে আওয়াজ তুলেছে। সেখানে এরই মধ্যে ৯৬ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ সায় দিয়েছে।
দিল্লি চিড়িয়াখানার পরিচালক সোনালী ঘোষ বলেন, আদালত নির্দেশ দিলে শংকরকে স্থানান্তর করা হবে। এর আগে বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখবেন শংকর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার মতো অবস্থায় আছে কি না। কারণ, ‘বিষয়টি এমন যে এটি চিড়িয়াখানা থেকে সরিয়ে আফ্রিকার যেকোনো জায়গায় দিয়ে আসো।’
শংকরের ঘটনার মধ্য দিয়ে এখন এক বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে, তা হলো হাতির মতো এমন সংবেদনশীল প্রাণীকে বন্দী করে রাখা উচিত কি না? সোনালী ঘোষ বলেন, হাতি চিড়িয়াখানায় স্বাভাবিকভাবে খুব ভালো থাকতে পারে না। পৃথিবীব্যাপী অসংখ্য গবেষণায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই এগুলোকে শুধু কষ্ট দেওয়ার জন্য এখানে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না।
২০০৯ সালে ভারতের সেন্ট্রাল জু অথরিটি চিড়িয়াখানায় হাতি প্রদর্শন এবং ৬ মাসের বেশি সময় কোনো হাতিকে একা না রাখার বিধান জারি করে। তবে প্রাণী অধিকার কর্মীদের দাবি, এর পর খুব সামান্যই এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।