বাঁকুড়ায় তিন খাঁর সঙ্গে এক সাঁতরার লড়াই

পশ্চিমবঙ্গের লোকসভার ৪২ আসনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন হল বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর। বিষ্ণুপুর এক ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক এলাকা। পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রের একটি নামী পর্যটনকেন্দ্র। এই বিষ্ণুপুর বাঁকুড়ার একটি মহকুমা শহর, ইতিহাসখ্যাত। মন্দির আর টেরাকোটা শিল্পের জন্য ভুবনবিখ্যাত। বিখ্যাত বালুচরি শাড়ির জন্যও।


এই বিষ্ণুপুর আসনটি আবার তপসিলি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত। একসময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বাঁকুড়া ছিল বামদের দখলে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাঁকুড়ার দুটি লোকসভা আসনেই জয়ী হয়েছিল বামফ্রন্ট। তারপর ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন মমতা। শুরু হয় রাজ্যপাট থেকে বাম হটানোর অভিযান। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই বিষ্ণুপুরে বাম প্রার্থীকে হারিয়ে জয়ী হন তৃণমূলের প্রার্থী সৌমিত্র খাঁ। কিন্তু নির্বাচনের পর তৃণমূলপ্রধান পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় একসময় এই সাংসদ সৌমিত্র খাঁ তৃণমূল থেকে দূরে সরে যান। দূরত্ব তৈরি হয় দলের সঙ্গে। অবশেষে এই সৌমিত্র খাঁ এবার ৯ জানুয়ারি যোগ দেন বিজেপিতে। বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি লোকসভা নির্বাচনে লড়ার জন্য বিজেপির টিকিটও পেয়ে যান। ফলে দল বদল হলেও এবার তিনি নেমেছেনও ভোট লড়াইতে।

আর এই আসনে এবার তৃণমূল প্রার্থী করেছে দলীয় বিধায়ক ও রাজ্যের মন্ত্রী শ্যামল সাঁতরাকে। শ্যামল সাঁতরা এই জেলার কোতলপুর বিধানসভা আসনের বিধায়ক এবং রাজ্যের মন্ত্রী।

অন্যদিকে বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস এই আসনে প্রার্থী করেছে যথাক্রমে সুনীল খাঁ এবং নারায়ণ চন্দ্র খাঁকে। সুনীল খাঁ বামফ্রন্টের শরিক সিপিএমের নেতা। ১৯৯৬ সালে ছিলেন সাংসদও। এবার তিনি বিষ্ণুপুর আসনে বামফ্রন্টের প্রার্থী। আর কংগ্রেস প্রার্থী করেছে নারায়ণ চন্দ্র খাঁকে। তিনি একজন আইনজীবী। ফলে এবার এই আসনে হচ্ছে চতুর্মুখী লড়াই। তিন খাঁর সঙ্গে এক সাঁতরার।

অতীতের ইতিহাস বলছে, এই বিষ্ণুপুর আসনে এখনো প্রচুর বাম সমর্থক রয়েছেন। ২০০৯ সালে সিপিএম জিতলেও ২০১৪ সালে তারা হেরে যায়। জয়ী হয় তৃণমূল। এবার এই আসনে জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে অন্যান্য প্রার্থীর সঙ্গে রাজ্যের এই চার বড় দলের চার প্রার্থী। চারজনের প্রত্যেকেই নিজের জয় দাবি করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এবার এই আসনে চতুর্মুখী লড়াই হবে। বাম দল এবং বিজেপি কোমর বেঁধে নেমেছে।
তৃণমূলের কথা, রাজ্যে চলছে এখন তৃণমূলের উন্নয়নের জোয়ার। রাজ্যবাসী এবারও তৃণমূলকে ছাড়বে না। বিপুল ভোটে জয়ী করবেন তৃণমূলের প্রার্থীকে। আবার বিজেপি বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন চলছে পরিবর্তনের হাওয়া। রাজ্যের মানুষ তৃণমূলী শাসন থেকে মুক্তি চায়। মোদি হাওয়া এখন রাজ্যজুড়ে। তাই বাংলার মানুষ ভোট দেবেন বিজেপিকে। বামফ্রন্টের কথা, এই আসনটি অতীতে ছিল বামদের। এখানে বামরা অনেক উন্নয়নকাজ করেছে। এবার এই বাংলায় একদিকে তৃণমূলবিরোধী আর অন্যদিকে বিজেপিবিরোধী হাওয়া চলছে। মানুষ এবার তাই এই দুই দলকে ভোট না দিয়ে ভোট দেবেন ফের বাম দলের প্রার্থীকে। আর কংগ্রেসের ভাবনা, এই চতুর্মুখী লড়াইয়ের মাঝ দিয়ে তারা জিতে যেতে পারে এই বিষ্ণুপুর আসনে। আর এসব চিন্তাভাবনা নিয়ে এখন এই আসনের রাজনৈতিক জমি চষে বেড়াচ্ছেন চারদলসহ অন্যান্য ছোট দলের প্রার্থীরা।
এই বিষ্ণুপুর আসনের নির্বাচন ষষ্ঠ দফায় হবে আগামী ১২ মে।