সারদা মামলায় জেরার জন্য ৮ পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চাঞ্চল্যকর সারদা আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলা নিয়ে তৎপর মামলার তদন্ত সংস্থা সিবিআই। মূলত তিনটি দুর্নীতি মামলা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গন সোচ্চার। এই মামলা তিনটি হলো সারদা, রোজভ্যালি ও নারদ আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলা।
আগামী বছর অনুষ্ঠেয় ভারতের লোকসভা নির্বাচনের আগে এ মামলা নিয়ে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ তুলেছে রাজ্যের শাসক দলের নেতারা। তাঁরা বলছেন, বিশেষ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক ইস্যু তুলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনীতি উত্তপ্ত করে তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে এনআরসিসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যখন রাজনীতি জেরবার করে তুলেছে, তখনই সারদা মামলা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তৎপর হওয়ায় রাজনীতি ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে আরেকটি আর্থিক কেলেঙ্কারি মামলা রোজভ্যালির প্রথম চার্জশিট দেওয়া হয়েছে আদালতে।
অন্যদিকে, সারদা মামলায় গতি আনতে এবার এ মামলার আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য কলকাতার চার শীর্ষ আইপিএস পুলিশ কর্মকর্তাকে চার দিনের মধ্যে সিবিআই অফিসে তলব করেছে। সিবিআই চাইছে—এই চার পুলিশ কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে। এই চার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হলেন—কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার, কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার বিনীত কুমার গোয়েল, আইজি (রেল) তমাল বসু এবং অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দাপ্রধান পল্লব কান্তি ঘোষ।
সারদা তদন্তে তৎকালীন ডিজির নির্দেশে সিট বা স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম—এর প্রথম সদস্য হিসেবে তাঁদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে সিবিআই মনে করছে। এ লক্ষ্যে চার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে জেরার জন্য সিবিআই অফিসে তলব করেছে। সারদা মামলা শুরুর প্রথম দিকে রাজীব কুমার ছিলেন বিধান নগরের পুলিশ কমিশনার। তিনিই প্রথম তদন্ত শুরু করেছিলেন। সিটের সঙ্গে ওই চার শীর্ষ কর্মকর্তা ছাড়াও সেদিন এই মামলার সঙ্গে আরও যুক্ত ছিলেন চারজন ইন্সপেক্টর। তাঁদেরও তলব করেছে সিবিআই। ফলে সারদা মামলার তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে।
সারদা মামলার তদন্ত জোরদার করার লক্ষ্যে নতুন করে সিবিআই তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চেয়েছে। সিবিআই মমতার বাড়ির কাছের হরিশ মুখার্জি শাখায় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় হিসাবে ১০ লাখ রুপির ওপর জমা দেওয়া ডিমান্ড ড্রাফট বা ডিডির তথ্য চেয়েছে সিবিআই। একই সঙ্গে ওই সব ডিডি দাতার নাম-ঠিকানাও চেয়েছে। এর আগে সিবিআই ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে তৃণমূল কংগ্রেসের ২১টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছিল।
সারদাগোষ্ঠীর কর্ণধার সুদীপ্ত সেন অভিযোগ করেছেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁর সংস্থার সম্পত্তি লুট হচ্ছে। বেনামে বিক্রি হচ্ছে। এর বিহিতও দাবি করেছেন তিনি। সুদীপ্ত সেন এখন কারাগারে রয়েছেন।
সারদা মামলার তদন্তে ঢিলেমির জন্য কলকাতার সিবিআইয়ের যুগ্ম অধিকর্তা অভয় সিংহকে কলকাতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অভয় সিং ছিলেন পশ্চিমবঙ্গে দায়ের করা সারদা, রোজভ্যালি ও নারদ আর্থিক দুর্নীতি মামলার সুপারভাইজিং কর্মকর্তা। দিল্লির সিবিআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা রাকেশ আস্থানা মামলার দ্রুত তদন্ত শেষে চার্জশিট দেওয়ারও নির্দেশ দেন।
পশ্চিমবঙ্গের তিনটি চাঞ্চল্যকর আর্থিক দুর্নীতি মামলার তদন্তে খুশি হতে পারেনি ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই। দীর্ঘদিন আগে মামলা দায়ের হলেও সিবিআই এখনো মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জমা দিতে পারেনি। এতেই অখুশি সিবিআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
২০১৬ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কজন নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কের অর্থ গ্রহণের চাঞ্চল্যকর ভিডিও তথ্য ফাঁস করে দিল্লির নারদ নিউজ ডটকম নামের একটি ওয়েব পোর্টাল। স্টিং অপারেশনের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা ও মন্ত্রীর হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে টাকা।
এ ঘটনার আগে ২০১৩ সালের এপ্রিলে ফাঁস হয় সারদা অর্থ কেলেঙ্কারি। অভিযোগ ওঠে, ১৭ লাখ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পের নামে ১৪ হাজার কোটি রুপি তোলা হয়। সেই অর্থ কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হয় সারদা কেলেঙ্কারি মামলায়। এ মামলায় জড়িয়ে সেদিন গ্রেপ্তার হন সারদাগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সুদীপ্ত সেন, তৃণমূল সাংসদ কুণাল ঘোষ, সঞ্জয় বসু, রাজ্য পুলিশের সাবেক ডিজি রজত মজুমদার, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্রসহ অন্য নেতারা।
২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে আরেকটি অর্থ কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস হয়। সেটি রোজভ্যালি আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত। মামলায় ৬০ হাজার কোটি রুপির আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। এই মামলায় জড়িয়ে গ্রেপ্তার হন রোজভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুন্ডু, তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ ও অভিনেতা তাপস পাল প্রমুখ।