এক ট্রাম্পের পাল্লায় পড়ে ন্যাটো কি অস্তিত্ব হারাবে

আজ ৪ এপ্রিল, ঠিক ৭৭ বছর আগে এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে গড়ে ওঠে একটি সামরিক জোট—নাম নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন, সংক্ষেপে ন্যাটো। প্রতিষ্ঠা থেকে এখন পর্যন্ত ন্যাটো বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী ভাবনা থেকে যে সামরিক জোটের জন্ম হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে সে জোটের অস্তিত্ব রক্ষা বর্তমানে চরম সংকটে।

ন্যাটোর পতাকাফাইল ছবি: এএফপি

ন্যাটো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো রাখঢাক নেই। প্রায় আট দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা এই জোটকে ‘সেকেলে’ মনে করেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এ কথা তিনি বলেছিলেন প্রথমবার প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার আগেই, ২০১৭ সালে। তাঁর অভিযোগ, ন্যাটো সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা দিতে ব্যর্থ।

এরপর সময় যত গড়িয়েছে, ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্পের বিরোধ বেড়েছে। তিনি ন্যাটোকে বারবার ‘কাগুজে বাঘ’ বলেন, জোটভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর তহবিল কম জোগানো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এর জেরে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে বের করে আনার হুমকিও দেন।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর ন্যাটোর সঙ্গে তাঁর বিরোধ আরও বাড়ে। এমনকি এ বছরের শুরুর দিকে ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের দখল পাওয়া নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন ট্রাম্প।

গ্রিনল্যান্ড দখলে ‘বলপ্রয়োগের’ হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক—উভয়ই ন্যাটো সদস্য হওয়ায় নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বলপ্রয়োগের হুমকি থেকে সরে এলে সে যাত্রায় সংকট এড়ানো সম্ভব হয়।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আবারও ন্যাটো জোট থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ন্যাটোর মোট ব্যয়ের বেশির ভাগ যুক্তরাষ্ট্র বহন করে, যা প্রায় ৬০ থেকে ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র একাই জোটভুক্ত বাকি দেশগুলোর সম্মিলিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে এ জোট রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

ওয়াশিংটনে ন্যাটো প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে সই করে ১২টি দেশ। ৪ এপ্রিল, ১৯৪৯
ছবি: ন্যাটোর ওয়েবসাইট থেকে

ন্যাটোর জন্ম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বিপর্যস্ত, অনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত ইউরোপকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয়েছিল সামরিক জোট ন্যাটো। ইউরোপকে সামরিক সুরক্ষা দিতে এ জোট গড়ে তোলা হলেও এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুপ্ত বাসনা ছিল। সেটা হলো, আটলান্টিকের ওপারে সমাজতন্ত্রের বিস্তার আটকে দিয়ে পুঁজিবাদী ধারণা বিস্তারের পথ প্রশস্ত করা এবং বিশ্বের একক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা।

এ লক্ষ্যে ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনে সই হয় ন্যাটো সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, যেটিকে ‘ওয়াশিংটন চুক্তি’ নামেও ডাকা হয়। প্রাথমিকভাবে ১২টি দেশ চুক্তিতে সই করে। তারা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও পর্তুগাল।

ধীরে ধীরে আরও দেশ এ জোটে শরিক হয়, বাড়তে থাকে ন্যাটোর পরিধি। বর্তমানে ৩২টি দেশ এ জোটের সদস্য। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে ন্যাটোয় যোগ দেয় সুইডেন। দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষতার নীতি ছুড়ে ফেলে দেশটি ন্যাটোয় যুক্ত হয়েছে।

ন্যাটোর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। ন্যাটোর বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতে। তিনি ১ অক্টোবর ২০২৪ থেকে এ দায়িত্ব পালন করছেন। রুতে নেদারল্যান্ডসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

ন্যাটোর পাল্টায় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালে গঠিত হয়েছিল ওয়ারশ জোট। তিন দশক আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বীহীন হয়ে পড়ে ন্যাটো, তাতে এর গুরুত্বও অনেকটা কমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রথম মেয়াদে ব্যয় নিয়ে ট্রাম্পের অসন্তোষ

রিপাবলিকান প্রার্থী হয়ে ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসে আসার আগে থেকেই ন্যাটোর সমালোচনায় মুখর ছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তাঁর অভিযোগের মূলে ছিল, ন্যাটোর মিত্রদের অপর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়।

ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় অংশীদারেরা নিজেদের সুরক্ষায় যথেষ্ট ব্যয় করছে না, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপছে। এমন অভিযোগ তুলে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের ব্যয় বাড়াতে বাধ্য করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে নিজের স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অন মাই ওয়াচ’-এ ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ লিখেছেন, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ন্যাটো জোট ছেড়ে প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলেন।

জেনস স্টলটেনবার্গ লেখেন, ‘আমরা স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলাম, ট্রাম্প তাঁর হুমকি কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’

স্টলটেনবার্গ বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তিনি ফক্স নিউজে গিয়ে ট্রাম্পের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্পের চাপের কারণেই ন্যাটোর মিত্ররা সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে।

ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই প্রশংসার জবাব দেন। এরপর ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের তৈরি করা সম্ভাব্য ভাষণটি ট্রাম্প আর দেননি।

সে সময় ট্রাম্পের আপত্তির মূল কারণ ছিল ২০১৪ সালের একটি চুক্তি। সেই চুক্তিতে সদস্যদেশগুলোর জিডিপির ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছিল; যদিও তখন এটি ছিল কেবল একটি ‘নির্দেশনা’, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়। তাই ন্যাটো জোটের অধিকাংশ দেশ এই নির্দেশনা পূরণ করত না।

২০২৫ সালে ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (প্রথম সারিতে মাঝে) ও বিশ্বনেতারা। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে
ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার চাপ অথবা ট্রাম্পের হুমকি

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ করার পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিতে ন্যাটোর প্রায় সব সদস্যদেশ তাদের সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।

এদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় এসে ন্যাটো নিয়ে আবারও একই কথা বলতে শুরু করেন ট্রাম্প, এবার তাঁর দাবি আরও বেশি ব্যয়।

এবার ন্যাটোকে হুমকি দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, যদি জোট সদস্যরা নিজেদের ভাগের চাঁদা না দেয়, তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ‘যা খুশি তা–ই’ করতে উৎসাহ দেবেন তিনি।

অবশ্য ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে ন্যাটো জোটের সব সদস্যকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ করার আহ্বান জানিয়েছিল, জোটের বেশির ভাগ সদস্য সেটা করছিল। ২০২৪ সালে তাদের গড় ব্যয় ছিল জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ।

সে সময় ন্যাটো মহাসচিব রুতে বলেছিলেন, কানাডা এবং ইউরোপীয় মিত্ররা ২০১৭ সাল থেকেই ব্যয় বাড়িয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৫ শতাংশ।

গত বছর বার্ষিক সম্মেলনে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করতে সম্মত হয়। আগামী ১০ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। সদস্যরাষ্ট্রগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিবছর জিডিপির ৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা চাহিদা এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগের অঙ্গীকার করে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জিডিপির ৫ শতাংশ দুই ভাগে ভাগ করা হবে। সাড়ে ৩ শতাংশ বরাদ্দ হবে মূল প্রতিরক্ষা খাতে। অন্যদিকে বাকি দেড় শতাংশ ব্যয় করা হবে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাত, যেমন সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নে।

ডেনমার্ক বিমানবাহিনীর একটি উড়োজাহাজে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানীতে পৌঁছান ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা
ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রসঙ্গ গ্রিনল্যান্ড

ট্রাম্পের দাবি মেনে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েও স্বস্তিতে থাকতে পারেনি ন্যাটো। বরং ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের একগুঁয়ে দাবির মুখে প্রথমবারের মতো সত্যিকারের অস্তিত্বের সংকটে পড়ে গিয়েছিল ন্যাটো।

গ্রিনল্যান্ড দখলে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। আধা স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ডেনমার্ক ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। তাই গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের বলপ্রয়োগ ন্যাটোর ওপর সরাসরি আঘাত হতো।

অথচ ন্যাটো গঠনের মূলমন্ত্র সম্মিলিত নিরাপত্তা। ন্যাটো চুক্তির আর্টিকেল ৫–এ বলা আছে, জোটভুক্ত কোনো দেশ যদি বিদেশি শক্তির আক্রমণের শিকার হয়, তাহলে জোটের সব সদস্যদেশ একযোগে তা প্রতিহত করবে। অর্থাৎ, সদস্যদেশগুলো সম্মিলিতভাবে একে অপরকে সুরক্ষা দেবে।

কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ন্যাটোর জোটভুক্ত সদস্যরাই মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিল। ট্রাম্পের বলপ্রোয়োগের হুমকির মুখে ডেনমার্ক সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করে। ন্যাটো জোটের আরও ছয় দেশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসও গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষার জন্য সেখানে সেনা পাঠিয়েছিল। পরে ট্রাম্প তাঁর হুমকি থেকে সরে আসেন, সে যাত্রায় ন্যাটো নিজেদের মধ্যে সংঘাত এড়াতে সক্ষম হয়।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা চলছে
ফাইল ছবি: এএফপি

ইরান যুদ্ধ

গ্রিনল্যান্ড ঘিরে সংকট কাটতে না কাটতেই আবারও ন্যাট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প, এবার তাঁর হুমকি বেশ গুরুতর।

ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ংকর এক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয়।

এটি খুলতে সহযোগিতার জন্য মিত্রদেশগুলোকে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু তারা সেই আহ্বানে কেউ সাড়া দেয়নি।

উল্টো স্পেন, ইতালি ও ফ্রান্স এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

এর ফলে ইউরোপকে আর নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার মনে করছে না যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে ট্রাম্প আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমরা ইউক্রেনসহ সব ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ইউক্রেন আমাদের সমস্যা ছিল না। এটি ছিল একটি পরীক্ষা। আমরা তাদের পাশে ছিলাম। আমরা সব সময় তাদের পাশে থাকতাম, কিন্তু তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি।’

যুদ্ধে দীর্ঘদিনের ন্যাটো মিত্রদের অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউস ক্রমে হতাশ হয়ে পড়ছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটোর সদস্যপদের বিষয়টি ‘পুনরায় পর্যালোচনা’ করে দেখতে হবে।

ট্রাম্পের সহায়তার আহ্বানে ন্যাটোর বাকি সদস্যদের সাড়া না দেওয়ার ফলে ন্যাটো চুক্তির ‘আর্টিকেল ৫’ নিয়ে আবার আলোচনা হচ্ছে। আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, এক সদস্যদেশের ওপর আক্রমণ মানে সবার ওপরে আক্রমণ।

ইতিহাসে মাত্র একবার আর্টিকেল ৫ কার্যকর করা হয়েছিল, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর। টুইন টাওয়ারে হামলার পর আফগান যুদ্ধে ন্যাটো যোগ দিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি অমার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন। এর মধ্যে ৪৫৭ জন ছিলেন ব্রিটিশ সেনা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হয়। তাই এটি ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। কারণ, এ যুদ্ধ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছে।

ট্রাম্প কি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিতে পারবেন

২০২৩ সালের শেষ দিকে মার্কিন কংগ্রেস এক ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ন্যাটো থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রকে এই জোট ছাড়তে হলে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

ন্যাটো নেতারা এবং বিশেষ করে বর্তমান মহাসচিব মার্ক রুতেও ট্রাম্পকে এটা বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে এই জোটে থাকা ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থেই প্রয়োজন।

স্টলটেনবার্গের মতো মার্ক রুতেও ‘ট্রাম্প হুইস্পারার’ (বশে রাখার কারিগর) হিসেবে পরিচিত।

জানা যায়, খামখেয়ালি এই প্রেসিডেন্টকে বাগে রাখতে রুতে গোপনে ও প্রকাশ্যে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ডাচ এই নেতা ট্রাম্পকে প্রশংসায় ভাসিয়ে নানা কাজে রাজি করাতে দক্ষ বলে পরিচিত।

ট্রাম্পকে তাঁর গ্রিনল্যান্ড ‘দখলে’ নেওয়ার অনড় অবস্থান থেকে সরিয়ে নিতে রুতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন বলে মনে করা হয়।

ইরান যুদ্ধ শেষে ট্রাম্প ও ন্যাটোর সম্পর্ক কোথায় গিয়ে ঠেকে, বিশ্ব সেটা দেখার অপেক্ষায়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এএফপি, ন্যাটো ওয়েবসাইট, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা