কঠিন এক পরীক্ষার মুখোমুখি জাপানের প্রধানমন্ত্রী

সানায়ে তাকাইচিফাইল ছবি

জাপানের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এমন কিছু সাফল্য অর্জন করেছেন, যা তাঁর অনেক পূর্বসূরির পক্ষেই সম্ভব হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দলের ভেতরে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি সংসদের নিম্নকক্ষে আগাম নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। দলের একটি অংশ মনে করেছিল, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার মতো তাকাইচিকেও হয়তো একই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। উল্লেখ্য, ইশিবা তাঁর ডাকা আগাম নির্বাচনে বেশ কিছু আসন হারানোয় শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন সানায়ে তাকাইচি। নিম্নকক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এলডিপিকে নীতিগতভাবে ছোট কিছু বিরোধী দলের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হতো। তাকাইচি চেয়েছিলেন সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের আগাম নির্বাচনে এলডিপির অভাবনীয় সাফল্য তাঁর অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। নিম্নকক্ষে প্রথমবারের মতো দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সংবিধান সংস্কারসহ দলের ভাবধারার বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে তাঁর ‘জাপানের মার্গারেট থ্যাচার’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন এখন আর অলীক কল্পনা বলে মনে হচ্ছে না।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ভেতরের উপদলীয় রাজনীতিও অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করতে পেরেছেন তিনি। সংসদে বিরোধীদের উপস্থিতি সংকুচিত করে দিয়ে এলডিপির দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পথও সম্ভবত প্রশস্ত করেছেন তাকাইচি।

তবে দেশের রাজনীতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনলেও বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তাঁকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপিত বর্ধিত শুল্কের বিষয়টি সামাল দিতে হচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে। তাঁর আসন্ন ওয়াশিংটন সফরে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনায় এই শুল্কের বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে। যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও জাপান এখন পর্যন্ত শুল্ক কমানোর সুবিধা আদায় করে নিতে পারেনি।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলার মধ্য দিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, যা কূটনীতির অনেক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন, বিশ্ববাজারে তেলের প্রবাহ সচল রাখতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার সামরিক পদক্ষেপে মিত্ররাও যোগ দিক। গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করেছেন। এ কারণে ১৯ মার্চ নির্ধারিত জাপান-মার্কিন শীর্ষ বৈঠকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সানায়ে অবশ্য এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। গত সোমবার সংসদ অধিবেশন চলাকালে তিনি জানান, আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জাপানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করা যায়, তা বিবেচনা করছে সরকার। জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হবে কি না—বিরোধী দলের এক সদস্যের এমন প্রশ্নের জবাবে তাকাইচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো অনুরোধ না করায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সহজ নয়। তবে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

বিদেশে যুদ্ধে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে জাপানের সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা থাকায় হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে সরাসরি অংশ নেওয়া তাদের পক্ষে কঠিন। এর বাইরে জাপানের জনমতও ইরানে মার্কিন হামলার বিপক্ষে। দেশটির শীর্ষ দৈনিক ‘আসাহি শিম্বুন’-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমর্থন করেন না; বিপরীতে সমর্থনের হার মাত্র ৯ শতাংশ।

জনমতের এই ভারসাম্যহীনতা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী হয়তো অতীতের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে কোনো পথ খুঁজে বের করতে চাইবেন। ১৯৯১ সালে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সামরিক অংশগ্রহণ এড়াতে জাপান বিশাল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দিয়েছিল। অন্যদিকে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনিইচিরো কোইজুমি সংবিধানের সীমাবদ্ধতা পাশ কাটিয়ে সংসদে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে আত্মরক্ষা বাহিনী পাঠিয়েছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, তাকাইচির জন্য দ্বিতীয় বিকল্পটি বেশ কঠিন হতে পারে। কারণ, ২০০৩ সালের তুলনায় বর্তমানে জাপানের জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে অনেক বেশি সোচ্চার এবং সেই সময় জ্বালানি তেলের প্রবাহ এভাবে বিঘ্নিত হয়নি।

জাপান সরকার অন্য একটি বিকল্পও বিবেচনা করছে বলে অনেকে মনে করছেন। সেটি হলো ‘অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করা। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের বদলে বরং নিজের অঞ্চলের সম্ভাব্য উত্তেজনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের এই সময়ে মার্কিন পক্ষ এমন প্রস্তাব কীভাবে গ্রহণ করবে, তা পরিষ্কার নয়।

ফলে হরমুজ প্রণালি এখন জাপানের জন্য অনেকটা ‘গলার কাঁটা’র মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ট্রাম্প-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠকে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রাধান্য পাবে। যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত যুক্তি দেবে যে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল জাপানি অর্থনীতির জন্য ইরান পরিস্থিতির গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। এই প্রতিকূল কূটনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ববাসীর।