ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান। এরপরও চলছে সম্মুখ হামলা। গতকাল বৃহস্পতিবার পাল্টাপাল্টি হামলার দাবি করেছে দুই পক্ষই। এ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে ইরানের হরমুজ প্রণালি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, তারা এ অঞ্চলে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন হামলার জবাব দেওয়া হয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে কোন মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে, তা জানায়নি আইআরজিসি।
এর মধ্যেই কুয়েতের সেনাবাহিনী গতকাল জানায়, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কোথা থেকে ছোড়া হয়েছিল, সেটা বলা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী গতকাল এক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একাধিক ড্রোন ভূপাতিতের দাবি করে। আরও বলা হয়েছে, ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাস এলাকায় দেশটির একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানি ড্রোন দিয়ে চালানো অভিযানকে লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। ওই স্থাপনা থেকে ড্রোন উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরানিরা।
বন্দর আব্বাস এলাকায় মার্কিন হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বিবৃতিতে বলেন, হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার ইরানের আছে।
তিন দিনের মধ্যে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাল। এসব হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। যদিও বলা হয়েছে, হামলাগুলো আত্মরক্ষামূলক ছিল।
বন্দর আব্বাসের যে সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছে, সেখান থেকে চারটি ড্রোন উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, এমন দাবি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকমের। আরও বলা হয়েছে, পঞ্চম ড্রোনটি উৎক্ষেপণের ঠিক আগে সেখানে হামলা চালানো হয়। ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবর, শহরটির পূর্বাংশ থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
সেন্টকম দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে হুমকি সৃষ্টিকারী চারটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তাদের এ অভিযান ‘পরিমিত, সম্পূর্ণ আত্মরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে পরিচালিত’।
অন্যদিকে আইআরজিসির বরাতে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, বন্দর আব্বাসে হামলার উৎস বিবেচনা করে মধ্যপ্রাচ্যের একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরান।
নতুন করে নিষেধাজ্ঞা
‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’ বা পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের এ কর্তৃপক্ষ বিশ্ববাণিজ্যের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নৌযানগুলো থেকে অর্থ আদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এক বিবৃতিতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের এই কর্তৃপক্ষকে কোনো জাহাজ অর্থ দিয়ে থাকলে তারাও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে কেউ যদি হরমুজ প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে তাহলে ধরে নেওয়া হবে, তারা আইআরজিসিকে সহযোগিতা করছে। সে ক্ষেত্রে তাদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
বিশ্বের এক–পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়ে থাকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানির বিশ্ববাজারে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই গত সোমবার বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি চালু রাখতে তেহরান বদ্ধপরিকর। তবে এ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ‘নৌ চলাচল পরিষেবার’ জন্য মাশুল নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এটিকে ‘সমুদ্রপথে পরিচালিত বৈশ্বিক বাণিজ্য থেকে অর্থ আদায়ে ইরানের সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ প্রচেষ্টা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে, তেহরান অর্থের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধে না ফেরার আহ্বান
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সর্বাত্মক যুদ্ধ এখন একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আওতায় সাময়িক স্থগিত আছে। এর মধ্যে তিন মাস পেরিয়ে গেছে। শুরুর মাস দেড়েক চলেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এরপর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু করে ওয়াশিংটন ও তেহরান। ইসলামাবাদের ওই শান্তি আলোচনা সুনির্দিষ্ট কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
এরপর পর্দার আড়ালে চলেছে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দারের আজ শুক্রবার ওয়াশিংটন সফর করার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এর মধ্যেই নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার খবর পাওয়া গেল। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলে সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি আবারও সামরিক পদক্ষেপে না ফিরতে দুই পক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছেন।