আমি এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট

নিউইয়র্কে আটককেন্দ্র থেকে আদালতে নেওয়ার পথে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। সোমবার নিউইয়র্কের ডাউনটাউন ম্যানহাটান হেলিপোর্টেছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে বিচারকের সামনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন তাঁরা। মাদুরো বলেছেন, ‘আমি এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।’

সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টার দিকে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ম্যানহাটান ফেডারেল আদালতে তোলা হয়। বিচারক ছিলেন ডিস্ট্রিক্ট জজ আলভিন হেলারস্টেইন। মাদুরোর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারি জোয়েল পোলাক। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের হয়ে মামলা লড়ার জন্য পরিচিতি রয়েছে তাঁর। প্রথম দিনের শুনানি শেষে আদালত আগামী ১৭ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।

আদালতে মাদুরো ও ফ্লোরেস—দুজনের পরনে ছিল কারাবন্দীদের পোশাক। মাদুরোর পায়ে ছিল ডান্ডাবেড়ি। প্রথমেই বিচারক হেলারস্টেইন তাঁকে পরিচয় নিশ্চিত করতে বলেন। জবাবে মাদুরো বলেন, ‘আমি নিরপরাধ। দোষী নই। আমি একজন ভদ্রমানুষ। আমিই এখনো আমার দেশের প্রেসিডেন্ট।’ শুনানিতে তাঁর স্ত্রীও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আদালতে হাজির করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটককেন্দ্র থেকে হেলিকপ্টারে করে নিউইয়র্কে আদালতের কাছের একটি হেলিপোর্টে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ভ্যানে তুলে আদালতে নেওয়ার কথা। যুক্তরাষ্ট্র, ৫ জানুয়ারি
ছবি: রয়টার্স

পুরো শুনানির সময় কাগজে নোট নিচ্ছিলেন মাদুরো। সেগুলো নিজের কাছে রাখার জন্য বিচার হেলারস্টেইনের কাছে অনুরোধ করেন তিনি। বিচারক অনুমতি দেন।

শুনানির শেষভাগে মাদুরোর আইনজীবী ব্যারি পোলাক বলেন, তাঁর মক্কেলের ‘সামরিক অপহরণ’ নিয়ে জটিল আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, মাদুরো এই মুহূর্তে মুক্তির আবেদন করছেন না। তবে ভবিষ্যতে এমন আবেদন করার অধিকার রয়েছে তাঁর। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলায় ফ্লোরেস আহত হয়েছেন বলে আদালতকে জানান তাঁর আইনজীবী মার্ক ডনেলি।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বোস্টনে, ৩ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: এএফপি

গত শনিবার ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিয়ে আসে মার্কিন বাহিনী। বন্দী রাখা হয় নিউইয়র্কের কুখ্যাত আটককেন্দ্র মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে। সেখান থেকেই সোমবার তাঁদের আদালতে নেওয়া হয়। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়। এদিকে ভেনেজুয়েলায় সেদিনের মার্কিন হামলায় অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।

আবার ট্রাম্পের হুমকি

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে আনার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা হচ্ছে। এসবের তোয়াক্কা না করে গত রোববারও হুমকি দিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল খাত উন্মুক্ত করতে চায়। এতে যদি তারা সহযোগিতা না করে এবং মাদক পাচার বন্ধ না করে, তাহলে আবার দেশটিতে হামলার নির্দেশ দিতে পারেন তিনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ফাইল ছবি: রয়টার্স

মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প এ কথাগুলো বলেন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে হুমকি দিয়ে তিনি বলেন, একজন ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ কলম্বিয়া চালাচ্ছেন। তিনি খুব বেশি দিন চালিয়ে যেতে পারবেন না। কিউবা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটিতে ‘সামরিক হস্তক্ষেপের’ আশঙ্কা কম। কারণ, তারা নিজেরাই পতনের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।

ট্রাম্পের হুমকির পর চাপের মুখে সোমবার ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার কথা বলেছেন। দেলসির ভাষ্য—আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দুই দেশের উন্নয়নের জন্য একসঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ভেনেজুয়েলা। তিনি বলেন, ‘আমাদের জনগণ, আমাদের অঞ্চল যুদ্ধ নয়, শান্তি ও সংলাপ চায়।’

নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক

মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার আইনি বৈধতা ও এর ফলাফল নিয়ে সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসে। বৈঠকে জাতিসংঘে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল রেইনাল্ডো মনকাদা আকস্তা কারাকাসে মার্কিন হামলাকে অবৈধ আখ্যায়িত করেন। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার ঘটনা জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক। ৫ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ কারাকাসে হামলাকে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেন। মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘে চীনের উপপ্রতিনিধি সান লেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ ও হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানায় বেইজিং। আর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘সশস্ত্র আগ্রাসনের’ নিন্দা জানান রুশ রাষ্ট্রদূত ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া।

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। বক্তব্যে গুতেরেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান না জানিয়ে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।