ইরানে সরকার পরিবর্তন হওয়াকেই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘোষণার মধ্যেই ট্রাম্প এমন মত প্রকাশ করলেন।
গত শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় এক সাংবাদিক তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তন চান কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’
ট্রাম্পের এ মন্তব্য এখন পর্যন্ত ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করার সবচেয়ে প্রকাশ্য আহ্বান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন সময় তিনি এ কথা বললেন, যখন কিনা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে ইরানকে একটি চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।
এর আগে হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড খুব শিগগির মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেবে।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যদি কোনো চুক্তি করতে না পারি, তবে আমাদের এটারই প্রয়োজন পড়বে।’
ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির নেতা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় থেকে এই বিশাল জাহাজ ক্যারিবীয় সাগর এলাকায় অবস্থান করছে। আরেক বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জায়গায় কাকে দেখতে চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি শুধু বলেছেন, ‘এমন মানুষ আছেন।’
এর আগে ইরানে সরকার পরিবর্তনের জোরালো আহ্বান থেকে ট্রাম্পকে কিছুটা সরে আসতে দেখা গিয়েছিল। তিনি তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, এমনটা হলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। যদিও তিনি খামেনির বিরুদ্ধে একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছেন।
গত মাসে ইরানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তা দমনে কঠোর অভিযান শুরু করে দেশটির সরকার। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছে। তবে পরে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে বেশি গুরুত্ব দেন। বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল গত ২৮ ডিসেম্বর। ইরানে অনেক দিন ধরেই মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বরে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতন সাধারণ ইরানিদের ওপর বিশাল বড় আঘাত হয়ে আসে। প্রতিবাদ জানাতে তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। দ্রুত ওই বিক্ষোভ ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা কমে এলেও ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। নির্বাসিত রেজা পাহলভি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেন, নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে মানবিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি দেশ-বিদেশের ইরানিদের আবারও আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবু গত সপ্তাহে তারা ওমানে পারমাণবিক ইস্যুতে বৈঠক করেছে। নতুন করে আলোচনার তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ইরানে কয়েক সপ্তাহ হামলা চালানোর প্রস্তুতি
ইরানে কয়েক সপ্তাহ সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুই মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই হামলা শুরু হবে। ওই কর্মকর্তারা বলেন, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগে দেখা যেকোনো সংঘাতের তুলনায় এটি অনেক বেশি গুরুতর রূপ নিতে পারে।
এই পরিকল্পনা সংবেদনশীল হওয়ায় ওই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে পরিকল্পনার খবর বাইরে আসা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতায় নিশ্চিতভাবে চাপ বৃদ্ধি করবে। গত সপ্তাহে ওমানের রাজধানী মাসকাটে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকেরা। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘কারসাজিতেই’ বিক্ষোভ
আল-জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটনই কৌশল করে ইরানে ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে রাতারাতি ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতন হয়। হঠাৎ করে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের জেরে সৃষ্ট আর্থিক সংকট গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল। রাজধানী থেকে সেই বিক্ষোভ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।