ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সমালোচকেরা বলছেন, কংগ্রেস বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া এ যুদ্ধ শুরু হওয়ায় এটি অবৈধ। তবে খামেনিকে হত্যা করার বিষয়টি আলাদাভাবে আরও জটিল আইনি প্রশ্ন তুলেছে।
একটি দেশ ইচ্ছাকৃত ও প্রকাশ্যে অন্য একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে হত্যা করবে, এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল, এমনকি আইনসম্মত যুদ্ধের সময়ও। ফলে এ প্রশ্ন খুব কমই সামনে এসেছে। একমাত্র কাছাকাছি নজির ধরা হয় ২০০৩ সালের মার্চে, যখন জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ইরাক যুদ্ধের প্রাক্কালে সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। সে যুদ্ধে কংগ্রেসের অনুমোদন ছিল, কিন্তু বিমান হামলাটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
হোয়াইট হাউসকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আইনি ব্যাখ্যা দিতে বলা হলে তারা এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘প্রধান সেনাপতি হিসেবে তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগ করে অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা ও ঘাঁটি রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ ইরানের কয়েক দশকের নানা ‘অপরাধের’ কথা বলা হলেও খামেনিকে হত্যার বিষয়টি সরাসরি ব্যাখ্যা করা হয়নি।
নিচে ইরানের বিরুদ্ধে এই দুই দেশের যুদ্ধ ও খামেনি হত্যার বিষয়গুলো ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো:
ইরানে কী ঘটেছে
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে দুই দেশ যৌথভাবে ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আকস্মিক হামলা চালায়। এতে প্রায় চার দশক ধরে ইরানের শাসক থাকা কট্টরপন্থী শিয়া ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিআইএ খামেনির গতিবিধি নজরদারি করে অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ইসরায়েলকে দেয়। ইসরায়েলই হামলা চালায়। সুযোগ কাজে লাগাতে পরিকল্পনাটি আগাম এগিয়ে আনা হয়েছিল বলে জানা যায়।
খামেনির অবস্থান কী ছিল
খামেনি ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি। তিনি ইরানের সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্মধারী সদস্য ছিলেন না। তবে তিনি একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কও ছিলেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বেসামরিক হলেও সামরিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার।
এই ‘দ্বৈত’ অবস্থান আইনি জটিলতা তৈরি করে। সাধারণভাবে যুদ্ধে একটি দেশের সামরিক কমান্ডাররা বৈধ লক্ষ্যবস্তু। আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মতো সামরিক দায়িত্বহীন বেসামরিক কর্মকর্তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলে বৈধ লক্ষ্যবস্তু নন।
কিন্তু একজন বেসামরিক নেতা, তিনি সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করেন—এ ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। সশস্ত্র সংঘাতের আইনের আওতায় সক্রিয় যুদ্ধে এমন নেতা বৈধ সামরিক লক্ষ্য হতে পারেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর অংশ হিসেবে বিবেচিত হোন বা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বেসামরিক হিসেবে ধরা হোক—আইন বিশেষজ্ঞদের এমন মত।
অন্য নেতারাও যখন লক্ষ্যবস্তু
ইরানের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকা মাহমুদ আহমেদিনিজাদও একটি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্পষ্টতই বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন এবং সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছিলেন না। তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর পক্ষে কোন আইনি যুক্তি দাঁড়াতে পারে, তা পরিষ্কার নয়।
সশস্ত্র সংঘাত কখন শুরু হলো
যে হামলায় খামেনি নিহত হন, সেটিকেই যুদ্ধের সূচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—হামলার মুহূর্তে তিনি কি বৈধ সামরিক লক্ষ্য ছিলেন?
শান্তিকালে কোনো বিদেশি সামরিক সদস্য বা সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যা করা, যদি তিনি তাৎক্ষণিক সশস্ত্র হামলায় জড়িত না থাকেন, তবে তা খুন হিসেবে গণ্য হবে।
যুক্তরাষ্ট্র অনুমোদিত জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনো দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে তার সম্মতি ছাড়া বলপ্রয়োগ করতে পারে না, যদি না তা আত্মরক্ষার যুক্তিতে বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে হয়।
কার্ডোজো ল স্কুলের অধ্যাপক ও সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা রেবেকা ইনগবার বলেন, ‘যুদ্ধের আইন অনুযায়ী কেউ বৈধ লক্ষ্য হলেও যদি হামলাটিই জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে, তবে সেটি অবৈধ। কোনো রাষ্ট্র অবৈধভাবে যুদ্ধ শুরু করে পরে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করার যৌক্তিকতা দাঁড় করাতে পারে না।’
‘আসন্ন’ হুমকি ছিল কি
আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে হলে জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী একটি সশস্ত্র হামলা সংঘটিত হওয়া প্রয়োজন। প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, আসন্ন হামলার হুমকির ক্ষেত্রেও আত্মরক্ষামূলক শক্তি প্রয়োগ বৈধ হতে পারে। কিন্তু ‘আসন্ন’ বলতে কী বোঝায়, সেটিই প্রশ্ন।
এই হামলার পর ট্রাম্প প্রশাসন এই যুক্তির দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যার ইঙ্গিত দিয়েছে। একটি ব্যাখ্যায় ‘আসন্ন হুমকি’ শব্দটির খুবই বিস্তৃত ও নমনীয় সংজ্ঞা ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হয়। অন্যটি আবার কিছুটা ঘুরপথে একই যুক্তিকে নিজেই প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করানোর মতো (চক্রাকার যুক্তি) বলে মনে হয়েছে।
গত শনিবার এক ভিডিওতে ট্রাম্প বলেন, লক্ষ্য ছিল ‘ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি দূর করে মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা।’ তবে তিনি বলেননি যে ইরান তাৎক্ষণিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বরং তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে দেওয়া যাবে না।
গতকাল সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই একটি আসন্ন হুমকি ছিল।’ তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছিল ইসরায়েল ইরানে হামলা করবে, আর তখন ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রতিরক্ষামূলকভাবে আগে থেকেই’ হামলায় যোগ দেয়।
প্রশাসন কি আন্তর্জাতিক আইন মানতে আগ্রহী
অনেকের ধারণা, এ অংশটি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের তেমন উদ্বেগ নেই।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার ঘটনাটিও জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করেছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু বিচার বিভাগীয় আইনি পরামর্শ দপ্তরের একটি নথিতে বলা হয়, ওই অভিযানের ক্ষেত্রে সনদের বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়, দেশীয় আইনের দৃষ্টিতে প্রেসিডেন্টের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।
কে হামলা চালিয়েছে, তা কি গুরুত্বপূর্ণ
রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার নীতিতে তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো দেশ যদি জেনেবুঝে অন্য দেশকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনে সহায়তা করে, তবে উভয় দেশই দায়ী হবে।
অতএব খামেনিকে হত্যা অবৈধ হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি জেনে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর অবস্থান জানিয়ে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু করতে সাহায্য করে থাকে, তবে যুক্তরাষ্ট্রও আইনি দায় বহন করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধ শুরু করা বৈধ ছিল কি
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই সীমিত সামরিক অভিযানে একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্বাহী শাখার আইনজীবীরা বলেন, যদি অভিযানটির ধরন, পরিধি ও সময় সাংবিধানিক অর্থে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ’ না হয়, তবে তা বৈধ হতে পারে।
তবু ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশনের পর বড় যুদ্ধে প্রেসিডেন্টরা আগাম অনুমোদন নিয়েছেন—পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ ও আফগানিস্তানে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে। ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ আইনটি পাস হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড় একতরফা সামরিক পদক্ষেপ হতে পারে।
‘হত্যা নিষেধাজ্ঞা’ কী বলছে
১৯৭০–এর দশকে সিআইএর বিদেশি নেতাদের হত্যার চক্রান্ত উন্মোচিত হলে জেরাল্ড ফোর্ড একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে ‘হত্যা’ নিষিদ্ধ করেন। সেটি এখন নির্বাহী আদেশ ১২৩৩৩–এর অংশ, যেখানে বলা আছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষে কর্মরত বা প্রতিনিধিত্বকারী কেউ হত্যায় জড়াতে বা হত্যার ষড়যন্ত্রে অংশ নিতে পারবে না।’ তবে ‘হত্যা’ কী, তার সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি।২০০১ সালে আল–কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে ও পরে নির্বাহী শাখা বলেছিল, আত্মরক্ষা বা সশস্ত্র সংঘাতের অংশ হিসেবে উচ্চপর্যায়ের সন্ত্রাসী নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা এই নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে না। তবে আল–কায়েদার সদস্যরা কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতা নন।
২০২০ সালে ট্রাম্প ইরাকে বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেন। বিচার বিভাগের যে স্মারক নথি সেই হামলাকে সমর্থন করেছিল, তার প্রকাশিত অংশে ‘হত্যা নিষেধাজ্ঞা’ নিয়ে আলোচনা নেই। তবে সেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল, সোলাইমানি বহু বছর ধরে ইরাকে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের হত্যায় ভূমিকা রেখেছেন।
এভাবেই বিদেশি রাষ্ট্রনেতাকে হত্যার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনের নানা স্তরে জটিল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।