ইয়েমেনে সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের মধ্যে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। দুই পক্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিনই। তীব্র লড়াইয়ের মুখে প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়েছেন লাখো মানুষ।
এরই মধ্যে সৌদি আরবের শক্তি বাড়াতে দেশটিকে অত্যাধুনিক এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান দিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে সংঘাত পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে পড়ছে।
ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যে জুলাই থেকে নতুন করে দ্বন্দ্বে জড়ায় ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি ও সৌদি আরব। ইয়েমেনে ক্ষমতায় রয়েছে সৌদি–সমর্থিত সরকার। লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় হুতিরা। তখন থেকে এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়। কয়েক দিন আগে এই প্রণালির একটি দ্বীপ ও কৌশলগত বন্দ মোখা দখলে নিয়ে ওই অঞ্চলে কর্তৃত্ব সংহত করে হুতিরা। এর পর থেকেই হুতিদের সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র হয়েছে। সৌদি আরবও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
গতকাল শুক্রবারও ইয়েমেনে ব্যাপক লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। এদিন দেশটির সৌদি–সমর্থিত সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তাইজ প্রদেশের আল-ওয়াজিয়াহ জেলায় তাদের সঙ্গে হুতিদের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয়েছে। এই লড়াইয়ে অন্তত ৩০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং ৬০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া প্রদেশের আল-ধিকরা, আল-দামনা ও আল-রাহিদা এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
এমন লড়াইয়ের মুখে বাস্তুচ্যুত মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাবে, সৌদি–হুতি সংঘাত শুরুর পর অন্তত ১ লাখ ১২ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে ইয়েমেনের বিভিন্ন স্থানে সরে গেছেন। এর বাইরে প্রায় ৩ হাজার ইয়েমেনি এডেন উপসাগর পেরিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
হুতিরা তেহরানের সমর্থন পায়। তাই সৌদি–হুতি লড়াইকে ইরান যুদ্ধের অংশ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। এ যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতে আরব দেশগুলোর কতটা ক্ষতি হলো, তার একটি হিসাব দিয়েছেন জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক অর্থনীতি ও সামাজিক কমিশনের নির্বাহী সচিব রনিয়া আল–মাশাত। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠাকি বৈঠকে তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে আরব দেশগুলোর অর্থনীতিতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এটি দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশের সমান।
পাল্টা হামলা চালাচ্ছে হুতিরাও
ইয়েমেনে এক দেশে দুই পক্ষের শাসন চলে। এক পক্ষে হুতিরা, অন্য পক্ষ সৌদি–সমর্থিত সরকার। সম্প্রতি সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে বাব আল–মানদেব প্রণালির মাইয়ুন দ্বীপ, হানিশ দ্বীপ, বন্দর শহর মোখা, তাইজ প্রদেশসহ কিছু অঞ্চল দখল করে নেয় হুতিরা। এতে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এখন পুরোটা তাদের দখলে এসেছে। যদিও কিছু অঞ্চল উদ্ধারের দাবি করেছে সরকারি বাহিনী।
গতকাল শুধু সরকারি বাহিনী হুতিদের ওপর হামলার খবর জানিয়েছিল। এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ করেনি হুতিরা। তবে আগের দিন বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছিল এএফপি। সে অনুযায়ী, আগের ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানের হামলায় অন্তত ৪০ জন হুতি যোদ্ধা নিহত হয়েছিলেন। আর ইয়েমেনের দুই প্রদেশে হুতিদের পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছিলেন ২৩ জন সরকারি সেনা।
এই সংঘাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে হুতিরা। গতকাল গোষ্ঠীটির নেতা আবদুল মালিক আল–হুতি বলেন, সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার পর সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েছেন তাঁরা। ইয়েমেনকে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে যেতে বাধ্য করেছে সৌদি আরব। আর সৌদি আরবের হয়ে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জায়নবাদীরা।
৪৮ এফ–৩৫ পাচ্ছে সৌদি
হুতিদের হামলার মুখে মিত্রদের কাছে সহায়তা চেয়েছে সৌদি আরব। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। তবে হুতি ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করার কথা জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। এখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সৌদির কাছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলারের ৪৮টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিতে আইনপ্রণেতাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
গত বুধবার হুতিরা সৌদি আরবের একটি এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবির পর এফ–৩৫ বিক্রির ঘোষণা এল। রাডার ফাঁকি দিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম অত্যাধুনিক এই যুদ্ধবিমানটি এর আগে শুধু ইসরায়েল ও ন্যাটো মিত্রদের কাছে বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সৌদির কাছে এই যুদ্ধবিমান বিক্রির ফলে আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে কোনো বদল আসবে না।
পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও সৌদি আরবের পাশে থাকার বার্তা এসেছে। আরব নিউজকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, তাঁরা কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে রিয়াদকে সমর্থন করবেন। গত মাসে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছিল পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। রিয়াদ আক্রান্ত হওয়ার পরও ওই চুক্তি মেনে এখনো প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসেনি ইসলামাবাদ।
সৌদির অনুরোধে হুতিদের লাগাম টানতে তেহরানকে আহ্বান জানিয়েছে চীন। অবশ্য ইরানকে চীন এ নিয়ে কতটা চাপ দিতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বেইজিং। পশ্চিমা এক কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, তেহরান ও বেইজিংয়ের একে অপরকে প্রয়োজন। চীন ইরানকে উপেক্ষা করতে পারে না। আবার বেইজিং এটাও চায়, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ থাকুক।