আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তাহলে কি নৃশংসতাকে উসকে দিচ্ছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

গত সপ্তাহে তেহরানে তেল ডিপোতে বিমান হামলার পর রাতের আকাশ এমন লাল হয়ে উঠেছিলছবি: এএফপি

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের মধ্যেই বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বলেন, যুদ্ধে ইরানকে ‘কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’। তাঁর এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে অধিকার গোষ্ঠীগুলো।

গতকাল শুক্রবার পিট হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা চাপ অব্যাহত রাখব, আঘাত হানব এবং সামনে এগিয়ে যাব। শত্রুদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, কোনো দয়া দেখানো হবে না।’

হেগ কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি অনুযায়ী, যুদ্ধে শত্রুপক্ষকে ‘রেহাই না দেওয়ার’ হুমকি বা আত্মসমর্পণকারীদের হত্যা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সামরিক আইন ও ১৯৯৬ সালের ‘ওয়ার ক্রাইমস অ্যাক্ট’–এ এই ধরনের নীতি নিষিদ্ধ।

চিন্তক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, হেগসেথের মন্তব্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। এটি সত্যি হতবাক করার মতো কথা। এসব আগ্রাসী ও বেআইনি মন্তব্যের প্রভাব যুদ্ধের ময়দানে পড়ছে কি না, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন।

তবে হেগসেথ প্রকাশ্যেই আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রণাঙ্গনে ধরাবাঁধা সেকেলে নিয়ম কিংবা তথাকথিত যুদ্ধের ব্যাকরণ মেনে চলবেন না।

এ ঘটনায় কিছু বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে যে আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো রয়েছে, সেগুলোকে উপেক্ষা করে যুদ্ধের ময়দানে কেবল ‘সর্বোচ্চ ধ্বংসলীলা’ চালানোকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

হেগসেথ এমন এক সময় এই মন্তব্য করলেন, যার কিছুদিন আগেই দক্ষিণ ইরানে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের বেশির ভাগই শিশু। চলমান এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪৪৪ জন বেসামরিক ইরানি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং গৃহহীন হয়েছেন লাখো মানুষ।

যুদ্ধে কাউকে ‘রেহাই না দেওয়ার’ নীতি এক শতাব্দীরও আগে থেকে নিষিদ্ধ। রণাঙ্গনে সেনাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই নিয়ম করা হয়েছিল। এই আইনি মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময়ও। আত্মসমর্পণকারী শত্রু সেনাদের রেহাই না দেওয়ার অপরাধে সে সময় অনেক নাৎসি কর্মকর্তার বিচার হয়েছিল।

ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, আসল কথা হলো, যারা অস্ত্র সমর্পণ করেছে, তাদের হত্যা করা অমানবিক এবং এটি হিতে বিপরীত ফল বয়ে আনে। সরকারের কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার পক্ষ থেকে শুধু ‘কাউকে রেহাই না দেওয়ার’ ঘোষণাই যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

ইরান যুদ্ধে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা এ যুদ্ধকে কোনো উসকানি ছাড়াই একটি অবৈধ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।

ভারতের সঙ্গে এক নৌ মহড়া শেষে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কা উপকূলে ইরানি সামরিক জাহাজ ‘আইরিস ডেনা’ ডুবিয়ে দেয় মার্কিন সাবমেরিন। এ ঘটনায় অন্তত ৮৪ জন নিহত হওয়ার পর কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল ইরান। যদিও রণতরিকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধরা হয়।

তবে ইরানের দাবি, জাহাজটি পুরোপুরি সশস্ত্র ছিল না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, জাহাজটিকে ধ্বংস না করে কি আটক করা যেত না?

জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, সাগরে জাহাজডুবির শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও সহায়তা করা বাধ্যতামূলক। অথচ অভিযোগ উঠেছে, আইরিস ডেনার ডুবন্ত নাবিকদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে অস্বীকৃতি জানায় মার্কিন বাহিনী। শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ধ্বংসাবশেষ থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েকজনকে উদ্ধার করে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জাহাজডুবির ঘটনাটিকে এক ‘নিভৃত মৃত্যু’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সাংবাদিকদের তিনি সাফ বলেন, ‘আমরা জেতার জন্যই লড়ছি।’

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, জাহাজটি কেন শুধু ডুবিয়ে দেওয়া হলো, কেন সেটি কবজা করা হলো না, এ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। জবাবে আমার এক জেনারেল বলেছেন, ‘স্যার, এভাবে কাজ করতে অনেক বেশি আনন্দ পাওয়া যায়।’

যুদ্ধে সাধারণ মানুষ হত্যার কারণে কয়েক দশক ধরেই মার্কিন সেনাবাহিনী সমালোচনার মুখে রয়েছে। কথিত ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ’ থেকে শুরু করে ২০০৮ সালে আফগানিস্তানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বিমান হামলা—সবখানেই ঝরেছে হাজারো প্রাণ।

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে ‘মাদক পাচারকারী’ সন্দেহে বিভিন্ন নৌযানে হামলা চালিয়েছে তারা। এতে অন্তত ১৫৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় যেমন শনাক্ত করা হয়নি, তেমনি তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণও দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। বিশ্লেষকেরা একে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে ধ্বংসলীলাকে প্রাধান্য দেওয়ার এই নীতি এখন ইরান যুদ্ধেও দেখা যাচ্ছে। ৪ মার্চ এক ব্রিফিংয়ে হেগসেথ দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘আকাশ থেকে সারা দিন শুধু মৃত্যু আর ধ্বংসের বৃষ্টি নামছে। আমরা এখন জীবন–মরণ খেলায় মেতেছি। আমাদের যোদ্ধাদের সেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা খোদ প্রেসিডেন্ট আর আমি দিয়েছি।’

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়াশিংটন ডিরেক্টর সারা ইয়াগার হেগসেথের এই ভাষাকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘২০ বছর ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছি। কিন্তু এমন কথা শুনে আমি স্তব্ধ। শীর্ষ নেতাদের এমন কথা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি যুদ্ধের গতিপথ ঠিক করে দেয়। নৃশংসতা ঠেকানোর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, আইনি বিধিনিষেধকে তুচ্ছজ্ঞান করা এক বড় ধরনের বিপৎসংকেত।’