সন্তান নিজের কি না জানেন না, তবু গাজার এক বাবা চালিয়ে যাচ্ছেন অনিশ্চিত সংগ্রাম
গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরের কথা। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টেনে বের করা হলো মোহাম্মদ লুব্বাদকে। উপত্যকার উত্তরাঞ্চলের বাইত লাহিয়া এলাকায় নিজের বাড়িতে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে হামলার শিকার হন তিনি। দিনটি ছিল ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবর। এই দিনই লুব্বাদের জীবনে গভীর এক মর্মবেদনা এবং অন্তহীন এক অনুসন্ধানের সূচনা করে।
গুরুতর আহত অবস্থায় লুব্বাদকে গাজার ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি একে একে পরিবারের সদস্যদের খবর পেতে শুরু করেন। লুব্বাদ জানতে পারেন, তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে একজন বেঁচে আছে। কিন্তু পাঁচ বছরের আদরের সন্তান রানা আর বেঁচে নেই। একই সঙ্গে তাঁর মা, ভাই, ভাইরের স্ত্রী এবং তাঁদের ছেলে-মেয়েরাও প্রাণ হারিয়েছেন।
পরিবারের প্রায় সব সদস্যের খবর পাওয়া গেলেও নিজের আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আমালের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না লুব্বাদ।
একসময় ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের কর্মীরা লুব্বাদকে জানান, আমালকে কামাল আদওয়ান হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু গাজার সেই ধ্বংসযজ্ঞ আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে কয়েক দিন পর দুঃসংবাদ আসে। জানা যায়, মাথায় ও পেটে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় আমালকে আল-শিফা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২২ অক্টোবর সেখানে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
স্বজন হারানো, শোক আর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার মধ্যে আমাদের কেবল একটি প্রশ্ন তাড়া করছিল—কোথায় সেই শিশু? এই পরিস্থিতি একবার কল্পনা করে দেখুন!
মেয়ে রানা আর প্রিয়তমা স্ত্রী আমালসহ স্বজনদের হারানোর শোকে পাথর হয়ে যান লুব্বাদ। কিন্তু শোকের মধ্যেই তাঁর মনে একটি গভীর প্রশ্ন দানা বাঁধে—কোথায় তাঁর সেই নবজাতক পুত্র? সে কি আদৌ বেঁচে আছে?
পরিচয়বিভ্রাট ও এক অধরা সত্যের খোঁজ
৩৫ বছর বয়সী কম্পিউটার প্রোগ্রামার মোহাম্মদ লুব্বাদ আল-জাজিরাকে বলেন, স্বজন হারানো, শোক আর ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনার মধ্যে আমাদের কেবল একটি প্রশ্ন তাড়া করছিল—কোথায় সেই শিশু? এই পরিস্থিতি একবার কল্পনা করে দেখুন।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে লুব্বাদ একটি সূত্রের খোঁজ পান। তাঁর শ্যালককে জানানো হয়, আল-শিফা হাসপাতালে থাকা একদল অপরিণত (প্রিম্যাচিউর) শিশুর মধ্যে তাঁর সন্তান থাকতে পারে।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে লুব্বাদ একটি সূত্রের খোঁজ পান। তাঁর শ্যালককে জানানো হয়, আল-শিফা হাসপাতালে থাকা একদল অপরিণত (প্রিম্যাচিউর) শিশুর মধ্যে তাঁর সন্তান থাকতে পারে। লুব্বাদ জানতে পারেন, আট মাসের মাথায় জন্ম নেওয়া এবং ১৩ বা ১৪ অক্টোবরের দিকে কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে আসা একটি শিশুর তথ্যের সঙ্গে তাঁর সন্তানের মিল রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধকালীন বিশৃঙ্খলায় হাসপাতালে কোনো সঠিক নথিপত্র বা নিবন্ধন ছিল না।
এরই মধ্যে এক চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। লুব্বাদের সন্তানের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাওয়া একটি শিশুকে অন্য একটি পরিবার নিজেদের বলে দাবি করে এবং তাদের নামে নিবন্ধন করায়। শুরু হয় এক অমীমাংসিত লড়াই।
গাজা পুলিশের তদন্ত বিভাগ আল-জাজিরাকে নিশ্চিত করে, একই সময়ে একই রকম পরিস্থিতিতে দুই নারী অপরিণত সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। ইসরায়েলের অবরোধ ও বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে নবজাতকের নিবিড় পর্যবেক্ষণকেন্দ্র বা এনআইসিইউতে থাকা বেশ কয়েকটা শিশু মারা যায়।
মোহাম্মদ লুব্বাদ ভেবেছিলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হয়তো রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃত্ব নিশ্চিত করবে। কিন্তু তার আগেই শিশুটিকে মিসরে সরিয়ে নেওয়ায় সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়।
হাসপাতালের কর্মীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া দুই মায়ের সন্তানদের মধ্যে একটি বেঁচে আছে, অন্যটি মারা গেছে। এখন সেই বেঁচে থাকা একমাত্র শিশুটিকেই দুই পরিবার নিজেদের বলে দাবি করছে।
নভেম্বরে আল-শিফা হাসপাতাল যখন ইসরায়েলের সেনারা ঘিরে ফেলে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জীবন রক্ষাকারী যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। যোগাযোগবিচ্ছিন্নতার কারণে লুব্বাদের জন্য তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ডিসেম্বরে লুব্বাদ জানতে পারেন, আল-শিফার শিশুদের চিকিৎসার জন্য মিসরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সন্তান দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ভয়ে লুব্বাদ দ্রুত রাফা সীমান্তের দিকে ছোটেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শিশুদের নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স গাজা ছেড়ে মিসরের পথে রওনা দিয়েছে।
ডিএনএ টেস্টই এখন একমাত্র ভরসা
মোহাম্মদ লুব্বাদ ভেবেছিলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হয়তো রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃত্ব নিশ্চিত করবে। কিন্তু তার আগেই শিশুটিকে মিসরে সরিয়ে নেওয়ায় সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় পর গত ৩১ মার্চ মিসরে থাকা সেই শিশুদের গাজায় ফিরিয়ে আনা হয়। ঘরে ফেরা শিশুদের মায়েদের জড়িয়ে ধরার আনন্দময় দৃশ্য যখন চারিদিকে দেখা যাচ্ছে, তখন লুব্বাদের নতুন লড়াই শুরু হয়।
গাজা উপত্যকার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে লুব্বাদ মিসর থেকে ফেরা সেই শিশুকে দেখতে ছুটে যান, যাকে তিনি নিজের সন্তান বলে বিশ্বাস করেন। কিন্তু সেখানে আগে থেকে অন্য পরিবারটি উপস্থিত ছিল, যাদের নামে শিশুটিকে নিবন্ধিত করা হয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে।
লুব্বাদের দাবি জোরালো হলেও পুলিশের তদন্ত বিভাগ জানায়, শিশুটির হাতে থাকা ব্রেসলেটে অন্য পরিবারের নাম ছিল। তবে তারা স্বীকার করেছে, যুদ্ধের ডামাডোলে কামাল আদওয়ান হাসপাতালের নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ায় এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবে আগের সেই নিবন্ধনকে চূড়ান্ত বলা যাচ্ছে না।
লুব্বাদ এখন ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান চান। তিনি বলেন, ‘ডিএনএ টেস্টই সব সংশয় দূর করতে পারে। ফল যা-ই হোক, আমি তা মেনে নিতে প্রস্তুত। শুধু সত্যটা জানতে চাই।’
কিন্তু প্রযুক্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার আল-শিফা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধের তাণ্ডবে ডিএনএ পরীক্ষার বিশেষায়িত গবেষণাগারগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।
গাজা পুলিশের মতে, এখন একমাত্র উপায় হলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নমুনা সংগ্রহ করে মিসর বা জর্ডানে পাঠানো।
এই অনিশ্চয়তা লুব্বাদকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। ঘরে তাঁর চার বছরের একমাত্র জীবিত মেয়ে জানার মুখের দিকে চেয়ে তিনি লড়ছেন।
লুব্বাদ বলেন, সত্য না জানা পর্যন্ত তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না, এমনকি কাজেও মন বসাতে পারছেন না। আল-শিফা হাসপাতালের সামনে স্বজনদের নিয়ে আন্দোলনের পরিকল্পনা করছেন এই বাবা।
ইসরায়েলের যুদ্ধ লুব্বাদের জীবন থেকে তাঁর স্ত্রী, এক মেয়ে ও স্বজনদের কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর ছেলেটি কোথাও বেঁচে আছে। আর সেই সত্যের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত থামবেন না তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘যেকোনো বাবা আমার জায়গায় থাকলে বুঝতেন, এই যন্ত্রণা কতটা গভীর। আমার পুরো জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে।’