এমন অবস্থায় চলতি জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় জিসিসি সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাইডেন বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে দূরে সরবে না যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া, চীন ও ইরানকে শূন্যস্থান দখল করে নিতে দেওয়া হবে না। তাঁর এ বক্তব্যের পর ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্থান দখল করতে পারবে না চীন’—এমন শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসি। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি–সংশ্লিষ্টদের কথায়ও মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার সম্ভাব্য কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আভাস পাওয়া গেছে। গত মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন আগামী দশকে চীনকে পরাস্ত করতে বাইডেন প্রশাসনের নেওয়া কৌশলগুলোর রূপরেখা প্রকাশ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে চীনের

মধ্যপ্রাচ্যকে কাছে টানতে চীনের রূপরেখাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। ৯ জুলাই ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, চীন একদিকে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের শত্রুদেশগুলোর সঙ্গেও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়িয়ে চলছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বেড়েছে। এগুলো সবই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে পরিচিত।

২০১৬ সালে চীন ও সৌদি আরবের মধ্যে সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ এ সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে অবকাঠামোগত নির্মাণ খাতে সহযোগিতা বাড়িয়েছে চীন। বর্তমানে গ্র্যান্ড মসজিদ পুনর্গঠন প্রকল্পেও যুক্ত আছে দেশটি।

মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মধ্যে তেল ও গ্যাসের মতো পুরোনো সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর পাশাপাশি নতুন নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। আর তা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে।

মার্চে জানা যায়, চীনে বিক্রি করা তেলের মূল্য মার্কিন ডলারের বদলে ইউয়ানে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সৌদি আরব। যদিও আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যব্যবস্থাটিতে বর্তমানে ডলারভিত্তিক লেনদেন চালু আছে।

২০২১ সালে চীন সৌদি আরবের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ৭৫ লাখ ৮০ হাজার টন। এর মধ্য দিয়ে চীনের আমদানি সহযোগী দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষ স্থানে উঠে আসে সৌদি আরব।

default-image

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন ও সৌদি আরব দুই পক্ষই এ উদ্যোগকে লাভজনক বলে বিবেচনা করছে।

মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বিষয়ে গবেষণা করেছেন ইউএস ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ডন মারফি। তিনি বলেন, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহার করে বাণিজ্য করতে পারলে মুদ্রার ওঠানামা ও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারবে চীন। অন্যদিকে এর মধ্য দিয়ে চীনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগীকে পাশে পাচ্ছে সৌদি আরব। আর এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে চীনের ব্যাপারে জানাশোনা বাড়াতে পারবে রিয়াদ।

যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কি চীনের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাবে

অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে দুই বড় শক্তিধর দেশের যে প্রতিযোগিতা, তা শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।

চীন-মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করেছেন ব্রাসেলস স্কুল অব গভর্ন্যান্সের সহযোগী অধ্যাপক গাই বারটন আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে বলে যে ঝুঁকির কথা বলা হয়ে থাকে, তা খুব সাধারণ বিষয়।’

গাই বারটন আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের উপস্থিতির বেশ খানিকটা সময়ই পেরিয়ে গেছে। এখন আর দেশটির রূপরেখা শুধু জ্বালানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা এখন ডিজিটাল, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রিয়েল এস্টেট খাত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এর মানে এ নয় যে তারা (মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো) যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে যাচ্ছে। চীনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো। তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গা দখল করে নিক, তা তারা চায় না। ’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরানকে মোকাবিলায় একটি নিরাপত্তা জোট গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বাইডেন। এ জোটে ইসরায়েল ও সৌদি আরবকেও রাখা হবে। যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটির নিরাপত্তা খাতে যত বিনিয়োগ করছে, তা চীনের চেয়ে বেশি।

মারফি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে চীনের রূপরেখাটি অর্থনৈতিক, এটি নিরাপত্তাজনিত নয়। দেশটির তেমন কিছুতে যুক্ত হওয়ারও লক্ষণ নেই।

অতীতে ইরাক থেকে কুয়েত পর্যন্ত আমেরিকান নিরাপত্তা উপস্থিতির কারণে লাভবান হয়েছে বেইজিং। কারণ, এসব দেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করেছে চীন। বারটন মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থ একই।

দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে চীন। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যে দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক জোরালো হচ্ছে তারা হয়তো পরস্পরের বিরোধী। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও ইরান উল্লেখযোগ্য। এ দুটি দেশ পরস্পরের শত্রু হলেও মধ্যপ্রাচ্যে তারা চীনের অন্যতম সহযোগী।

এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং সেখানকার দেশগুলোতে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে সফল হয়েছে চীন। ২০২১ সালে ইরানের সঙ্গে ২৫ বছরের সহযোগিতা কর্মসূচি চুক্তি স্বাক্ষর করে চীন। ইসরায়েল ও সৌদি আরবের সঙ্গেও চুক্তি করেছে বেইজিং। অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখার মধ্য দিয়ে চীন অনেক সমর্থন কুড়িয়েছে। চীনের প্রতি সৌদি আরব খুশি, কারণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দেশটির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখায় না বেইজিং। ইরানকে তারা আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশ হিসেবে বিবেচনা করে না।

তবে এত কিছুর পরও চীন মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য নীতি বজায় রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান কোনো কোনো বিশ্লেষক। মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ হলেও চীন কত দিন অঞ্চলটিতে তাদের অর্থনীতিভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি চালিয়ে নিতে পারবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন তাঁরা।

অবশ্য আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব এখন এক বড় অনিশ্চয়তার অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। গুটি কয় বড় খেলুড়ে দেশ থেকে কাউকে বেছে নেওয়াটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অনেক দেশের জন্য এখন অবাস্তব সিদ্ধান্ত।

সৌদি আরবের কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ তুর্কি আল সুদাইরি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো এক দেশকে বেছে নেওয়ার কথা ভাবছে না। দুই দেশকেই তাদের প্রয়োজন।

সূত্র: আল–জাজিরা, দ্য ডিপ্লোম্যাট, ভয়েস অব আমেরিকা, গ্লোবাল টাইমস অবলম্বনে ফাহমিদা আকতার

মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন