এক মাস ধরে চলা যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলো

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়েছে। এক মাস ধরে চলমান এ যুদ্ধে এবার সরাসরি যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতি। গতকাল শনিবার ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও চালিয়েছে ইরানপন্থী এই গোষ্ঠী।

হুতিরা আরব উপদ্বীপ ও লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলে বড় বাধা সৃষ্টি করতে সক্ষম। তারা সেই কৌশল নিলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা আরও বাড়বে। এতে চাপে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এ ছাড়া ইসরায়েলকে এখন ইরান ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পাশাপাশি হুতিদেরও সামরিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে।

এমন সময়ে হুতিরা যুদ্ধে জড়ানোর ঘোষণা দিল, যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ যুদ্ধ থামাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ইতিমধ্যে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের মাধ্যমে তেহরানের কাছে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। জবাবে তেহরান নিজের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখালেও অনড় অবস্থানে রয়েছে ইসরায়েল। গতকালও তারা ইরান ও লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ইরানের পরমাণু স্থাপনাও। এদিকে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। এতে অন্তত ১২ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।

পাল্টাপাল্টি এ হামলার মধ্যে যুদ্ধে হুতিদের যোগ দেওয়া ইসরায়েলের জন্য সংকটের কারণ হবে বলে মনে করেন দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর পাশাপাশি হুতিরাও যদি হামলা চালিয়ে যায়, তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। আবার হুতিদের হামলাকে রাজনৈতিকভাবে স্বাগতও জানাতে পারে ইসরায়েল। কারণ, নিজেদের লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় তারা।

‘ট্রিগারে আঙুল’

ইয়েমেনে শিয়া মুসলিম সংখ্যালঘুদের সশস্ত্র সংগঠন হুতি। তারা সংগঠিত হয় নব্বইয়ের দশকে। তখন তাদের নাম ছিল ‘আনসার আল্লাহ’। পরে গোষ্ঠীটির প্রয়াত নেতা হুসেইন আল–হুতির নামে ‘হুতি’ নামকরণ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ও পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ইরানের যে ‘প্রতিরক্ষাবলয়’ রয়েছে, তার একটি অংশ হুতি। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গাজার হামাসও এই বলয়ের অংশ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ২ মার্চ হিজবুল্লাহ চলমান যুদ্ধে যোগ দেয়। এরপর গতকাল হুতির সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ‘ইরান ও দেশটির মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে অন্য কেউ অংশ নেয়, তাহলে সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার জন্য আমাদের আঙুল বন্দুকের ট্রিগারে রয়েছে।’

এ ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে তারা। পরে ওই হামলার দায় স্বীকার করে হুতিরা। এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি জানায়, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তারা। লেবানন, ইরান ও ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার জবাবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এর আগে বিগত বছরগুলোতেও ইসরায়েল লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে গাজায় ইসরায়েলের জাতিগত নিধন চলাকালে ইসরায়েলে হামলা চালায় হুতিরা। তখন ইয়েমেন সীমান্ত থেকে বহুদূরে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিল তারা। এতে আরব উপদ্বীপ ও লোহিত সাগর ঘিরে পণ্য ও জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল বড় বাধার মুখে পড়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আহত হয়েছে আমির হোসেন নামের ছোট্ট শিশুটি। হাসপাতালে চলছে তার চিকিৎসা। গতকাল ইরানের রাজধানী তেহরানে
ছবি: রয়টার্স

লোহিত সাগর বন্ধ করে দিতে পারে হুতিরা

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তেল পরিবহনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজার। এমন পরিস্থিতিতে প্রণালিটি খুলে না দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যদিও তেহরানের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত এমন হামলা স্থগিত করেছেন তিনি।

ট্রাম্পের ওই হুমকিতে কোনো সাড়া দেয়নি ইরান। হুতির মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি লোহিত সাগরে ইরানবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সেদিকে ইঙ্গিত করে বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, হুতিরা বাব আল–মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং শেষ পর্যন্ত সুয়েজ খালও বন্ধ করে দিতে পারে তারা। এতে তেল পরিবহনে সংকট বাড়বে।

বর্তমানে সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়াতে লোহিত সাগর উপকূল দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরবরাহ করছে। ওই তেলবাহী জাহাজগুলো ইয়েমেনের পাশ দিয়ে যায়। সেগুলোয় হামলা চালাতে পারে হুতিরা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার কারণে বাব আল-মানদেব ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

ইসরায়েলকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে

গতকাল ছিল যুদ্ধের ২৯তম দিন। এদিন ও আগের রাতে ইরানের বিভিন্ন পরমাণু স্থাপনায় হামলা হয়। ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হাতে ফর্দো পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে। তেহরানেও দফায় দফায় বিস্ফোরণ হয়েছে। পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এ ‘অপরাধের’ জন্য ইসরায়েলকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ইরান সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসের যুদ্ধে ইরানে ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির ৯৩ হাজার বেসামরিক স্থাপনা। এর মধ্যে তেহরানে ধ্বংস হয়েছে ৩১ হাজার ৫৬২টি স্থাপনা। এরপরও গতকাল ফ্লোরিডায় ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে এখনো ৩ হাজার ৫৫৪টি লক্ষ্যবস্তু যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় রয়েছে। সেগুলোয় খুব শিগগির হামলা চালানো হবে।

লেবাননেও ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। গতকাল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক হামলা হয়েছে। এদিন লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর যোগাযোগ বিভাগের দুই নেতাকে হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে এখন পর্যন্ত ১২২ শিশুসহ ১ হাজার ১৪২ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখ মানুষ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ব্যঙ্গ প্রতিকৃতি নিয়ে ‘নো কিংস ডে’ বিক্ষোভ। নো কিংস আন্দোলন হলো তৃণমূল পর্যায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীর একটি জোট। গতকাল ওয়াশিংটনে
ছবি: এএফপি

বিমানঘাঁটিতে হামলায় ১২ মার্কিন সেনা আহত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে ইরান। এর মধ্যে ওমান উপকূলে সালালাহ বন্দরের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি। এ ছাড়া কুয়েত সরকার জানিয়েছে, দেশটির কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় রাডার ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

গতকাল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে। এ হামলায় আহত ১২ মার্কিন সেনার মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর অন্তত দুটি ‘কেসি-১৩৫’ রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ও একটি ‘ই-৩ সেন্ট্রি’ উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে যুদ্ধ চলাকালে তিন শতাধিক মার্কিন সেনা আহত হলেন। নিহত হয়েছেন ১৩ মার্কিন সেনা।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত তিন সাংবাদিকের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাড়ি দেখছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। গতকাল লেবাননে
ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধ থেকে ‘শিগগিরই’ বেরিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র

ইসরায়েল না চাইলেও বারবার যুদ্ধ শেষ করার কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে ‘ভালো’ আলোচনা চলছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার খবর নাকচ করেছে। এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, স্থলবাহিনী ছাড়াই ইরানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ইতিবাচক খবর দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। গতকাল এক পডকাস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে ‘শিগগিরই’ বেরিয়ে যাবে। তবে তিনি এ–ও বলেন যে ট্রাম্প আরও কিছু সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান, যাতে ইরানে আবার হামলা চালানোর প্রয়োজন না হয়। ইরানের সরকারকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দুর্বল করা প্রয়োজন। এটাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য।

এদিকে জেডি ভ্যান্স পাকিস্তানে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে পারেন বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এ বৈঠক নিয়ে ইতিমধ্যে তোড়জোড় শুরু করেছে মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন দেশ। আজ রোববার ও আগামীকাল সোমবার ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা রয়েছে সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। যুদ্ধ নিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গেও গতকাল ফোনালাপ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

তবে যুদ্ধ যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ কমে আসছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমারসি আল–জাজিরাকে বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সমাধানের চেয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হওয়ার দিকে এগোচ্ছে।