প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির লক্ষ্যে তুরস্ক, সৌদি, মিসর ও পাকিস্তানের বৈঠক
তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গত বৃহস্পতিবার এক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। সৌদির রাজধানী রিয়াদে ইসলামি দেশগুলোর একটি সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রথমবারের মতো দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা একীভূত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে।
তুরস্ক গত বছর থেকেই পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। চলতি বছরের শুরুর দিকে পাকিস্তানের এক মন্ত্রী এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, এ ধরনের একটি চুক্তি নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে কাজ চলছে।
এ উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তুরস্কের সূত্রগুলো এর আগে মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছিল, আঙ্কারা এই জোটে মিসরকেও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে। সূত্রগুলোর মতে, এ চুক্তিতে ন্যাটোর মতো সামরিক নিশ্চয়তা বা দায়বদ্ধতার বিষয়টি থাকবে না; বরং এটি প্রতিরক্ষাশিল্পে বৃহত্তর সহযোগিতা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা বিষয়ে একটি ‘নিরাপত্তা প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করবে।
গতকাল শনিবার তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘এই অঞ্চলে যেসব দেশের কোনো না কোনোভাবে প্রভাব রয়েছে, আমরা সেসব দেশ কীভাবে আমাদের শক্তিকে একীভূত করে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তা খতিয়ে দেখছি।’
হাকান ফিদান আরও বলেন, ‘সর্বোপরি, আমরা বেশ কিছু সময় ধরে বলে আসছি যে এ অঞ্চলের দেশগুলোর একসঙ্গে বসা উচিত, আলোচনা করা উচিত এবং নতুন ভাবনা তৈরি করা উচিত। আমরা আঞ্চলিক মালিকানার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।’
নীতিগতভাবে আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে, হয় আমাদের একজোট হতে হবে এবং নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে শিখতে হবে; অথবা কোনো বহিরাগত আধিপত্যবাদী শক্তি এসে তাদের স্বার্থ উদ্ধার হয়, এমন সমাধান চাপিয়ে দেবে কিংবা অন্যদের পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়ে নিজেরা নিষ্ক্রিয় বসে থাকবে।হাকান ফিদান, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দেশগুলো এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছে। এর মধ্যে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোয় তেহরানের পাল্টা হামলার বিষয়গুলোও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টা কী ধরনের সুফল বয়ে আনতে পারে, তা বিবেচনা করা হচ্ছে।
হাকান ফিদান বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে, হয় আমাদের একজোট হতে হবে এবং নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে শিখতে হবে; অথবা কোনো বহিরাগত আধিপত্যবাদী শক্তি এসে তাদের স্বার্থ উদ্ধার হয়, এমন সমাধান চাপিয়ে দেবে কিংবা অন্যদের পদক্ষেপ নিতে বাধা দিয়ে নিজেরা নিষ্ক্রিয় বসে থাকবে।’
‘নির্দিষ্ট ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে’
আঙ্কারা বারবার ইসরায়েলকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রধান উসকানিদাতা বলে আসছে। তবে বৃহস্পতিবার রিয়াদে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর যৌথ বিবৃতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোয় তেহরানের হামলার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বিবৃতিতে ইসরায়েলের নাম কোনোমতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং লেবাননে দেশটির ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির কথা বলা হয়েছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ‘আমাদের একে অপরকে বিশ্বাস করতে শিখতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একটি অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হতে হবে।’
হাকান ফিদান আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মিলিত উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে আঙ্কারার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও মিসরের মতো দেশগুলোর প্রতিটিরই উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তুরস্ক নিজেদের প্রতিরক্ষাশিল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং নিজস্ব প্রযুক্তিতে উন্নত ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছে রয়েছে পারমাণবিক বোমা। সৌদি আরব উন্নত প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আর মিসর সবচেয়ে জনবহুল আরব দেশ হিসেবে তাদের সামরিক সক্ষমতার কারণে এই অঞ্চলের শক্তিশালী দেশ হিসেবে বিবেচিত।
গত ফেব্রুয়ারিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কায়রো সফরের সময় তুরস্ক ও মিসর নিরাপত্তাক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে একটি দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তি সই করে।
ওই সফরের সময় তুর্কি অস্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেকানিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন’ মিসরের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ৩৫ কোটি ডলারের একটি রপ্তানি চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তির আওতায় গোলাবারুদ বিক্রি এবং মিসরে কারখানা স্থাপন করাও রয়েছে।