দ্বিতীয় দফা বৈঠক ঘিরে অনিশ্চয়তা

ছোট্ট শিশুদের মুখে হাসি, দেখাচ্ছে বিজয় চিহ্ন। এ খুশি ঘরে ফেরার। ইসরায়েলের হামলায় বাস্তুচ্যুত এই শিশুরা যুদ্ধবিরতির পর ফিরছে নিজ শহরে। গতকাল লেবাননের কাসমিয়েহ এলাকায়ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণার পরদিন গতকাল শনিবার আবার তা বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ায় তেহরান এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের এ ধরনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কঠোর হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অবশ্য এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নতুন কিছু প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তেহরান।

ইরান হরমুজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার কিছুক্ষণ পর গতকাল প্রণালিটি পার হওয়ার চেষ্টাকালে দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে ইরানের নৌবাহিনী। জাহাজ দুটি ভারতের পতাকাবাহী। আগের দিন হরমুজ খুলে দেওয়ার পর থেকে গতকাল গুলির ঘটনার আগে ৩টি জাহাজসহ ১২টির বেশি ট্যাংকার প্রণালিটি পার হয়েছে।

গতকাল কিছু বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানি নৌবাহিনীর কাছ থেকে একটি রেডিও বার্তা পেয়েছে। এতে জানানো হয়েছে, নৌপথটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নিজেদের সেনা দিবস উপলক্ষে গতকাল দেওয়া এক বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বলেন, ইরানের নৌবাহিনী তাদের শত্রুদের ওপর নতুন তিক্ত পরাজয় চাপিয়ে দিতে প্রস্তুত।

দ্বিতীয় দফার বৈঠকের আগে সমঝোতার রূপরেখা চূড়ান্ত করা জরুরি উল্লেখ করে গতকাল ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খাতিবজাদেহ বলেন, ‘এটি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা বৈঠকের সময় চূড়ান্ত করতে পারছি না।’

উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি এখন আলোচনার চেয়ে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কাই বেশি দেখছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জলদস্যুতায়’ হরমুজ বন্ধ ঘোষণা ইরানের

ইরানের সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল কমান্ড খতম আল-আম্বিয়া গতকাল এক বিবৃতিতে মার্কিন এ অবরোধকে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে, ‘এ কারণেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে এই কৌশলগত নৌপথটি সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরমুখী এবং ইরান থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজগুলোর চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা না দেবে, ততক্ষণ এ কড়াকড়ি বজায় থাকবে।

গতকাল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘোষিত ‘ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় এলাকা দিয়ে ঢুকতে বা বের হতে যাওয়া জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ’ অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ক্যানবেরা এ অবরোধের অংশ হিসেবে আরব সাগরে টহল দিচ্ছে। এ অভিযান চলাকালে এখন পর্যন্ত ২৩টি জাহাজ মার্কিন নির্দেশ মেনে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।

আরও পড়ুন

ইরান আমাদের জিম্মি করতে পারবে না

ইরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করার পর গতকাল ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, এই প্রণালির ভাগ্য নিয়ে লুকোচুরি খেলে তারা ওয়াশিংটনকে যেন জিম্মি করার চেষ্টা না করে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি। আপনারা জানেন, তারা আবারও প্রণালিটি বন্ধ করতে চেয়েছিল। এটা তারা বছরের পর বছর ধরে করে আসছে; কিন্তু তারা আমাদের জিম্মি করতে পারবে না।’

ট্রাম্প গতকাল বলেন, ‘দিনের শেষ দিকে ইরান সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যাবে। আমরা বেশ কঠোর অবস্থান নিচ্ছি।’

সমঝোতার রূপরেখা চূড়ান্ত করতে চায় ইরান

গতকাল তুরস্কের আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামের এক ফাঁকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খাতিবজাদেহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এখন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতার কাঠামো চূড়ান্ত করার দিকে মনোনিবেশ করছি। আমরা এমন কোনো আলোচনা বা বৈঠকে বসতে চাই না, যা ব্যর্থ হতে বাধ্য এবং যা নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধির অজুহাত হতে পারে।’

আলোচনার বিষয়ে জানেন এমন দুই কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, ইসলামাবাদের লজিস্টিকস বা প্রস্তুতির কথা বিবেচনায় নিলে বলতে হয়, দু–এক দিনের মধ্যে এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা কম।

প্রায় ছয় সপ্তাহের যুদ্ধ শেষে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়। স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা প্রায় ২১ ঘণ্টা সরাসরি বৈঠক করে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। এরপর ইরানের নৌবন্দরে অবরোধের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ১৩ এপ্রিল থেকে তা কার্যকর হয়।

এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা সত্ত্বেও পাকিস্তানসহ মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সরাসরি বৈঠকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। তেহরানে তিন দিনের সফর শেষে গতকাল দেশে ফিরেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

আসিম মুনিরের তেহরান ত্যাগের কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে জানায়, গত কয়েক দিনে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তেহরানে অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইরান বর্তমানে সেগুলো পর্যালোচনা করছে, কিন্তু এখনো কোনো চূড়ান্ত জবাব দেয়নি।

তবে ইরান কোনো আপস করবে না উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। ...যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ বহাল থাকা অবস্থায় এ নৌপথ শর্তসাপেক্ষ বা সীমিত আকারে খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। ...ভবিষ্যতে এই পথ খুলে দেওয়া হলে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ট্রানজিট সার্টিফিকেট দেবে ইরান। পাশাপাশি ওই সব জাহাজকে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও পরিবেশ রক্ষার সেবা বাবদ নির্দিষ্ট ফি দিতে হবে।

লেবাননে হামলা

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গতকাল ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বাইত লিফ, কান্তারা ও তুলিন শহরে কামানের গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে বুলডোজার দিয়ে লেবাননের ওই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি এলাকায় ঘরবাড়ি ধ্বংস ও ভূমি সমান করার কাজ অব্যাহত রেখেছেন ইসরায়েলের সেনারা।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী হামলার কথা নিশ্চিত করে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে যেসব এলাকায় এখনো ইসরায়েলের সেনারা অবস্থান করছেন, সেখানে লেবাননের যোদ্ধারা অগ্রসর হওয়ায় এসব হামলা চালানো হয়েছে।

লেবাননে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের ওপর এক হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ হামলা জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করেন। ইরানপন্থী গোষ্ঠীটি তা অস্বীকার করেছে।

লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ফরাসি কন্টিনজেন্টের সদস্যদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।