দুবাই ছাড়তে ধনকুবেরদের হুড়োহুড়ি, প্রাইভেট জেটের ভাড়া বেড়ে কয়েক গুণ
ইরানে ইসরায়েল ও এর ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার জেরে দুবাইয়ে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে তেহরানের হামলা এবং বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে বসবাসরত ধনীরা বিপাকে পড়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যনগরী ছাড়তে এখন প্রাইভেট জেটই এই ধনীদের একমাত্র ভরসা। ফলে বিকল্প পথে দেশ ছাড়ার হুড়োহুড়িতে ব্যক্তিগত বিমানের ভাড়া আকাশ ছুঁয়েছে।
ধনকুবের, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও লাখো পর্যটকের প্রমোদকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঝলমলে দুবাই এখন চরম উৎকণ্ঠার শহর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে শুধু দুবাই-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটি নিশানা করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান।
ইরানের হামলায় দুবাই বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরটির বেশ কিছু বিলাসবহুল হোটেল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত।
আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, গতকাল সোমবারও তারা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার জেরে তেহরানে নিজেদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে আমিরাত।
এ পরিস্থিতিতে দুবাই থেকে অনেকে পার্শ্ববর্তী ওমানের দিকে ছুটছেন। গাড়ি চালিয়ে ওমান যেতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা। সেখানে এ পর্যন্ত যুদ্ধের প্রভাব তেমনটা পড়েনি। ওমানের মাসকাট বিমানবন্দর এখনো চালু রয়েছে। তবে সেখানে ফ্লাইট ছাড়তে কিছুটা দেরি হচ্ছে।
বিভিন্ন অনলাইন টিকিট বুকিং সাইটের তথ্য অনুযায়ী, ওমানের মাসকাট থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের টিকিট চলতি সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত ফুরিয়ে গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, গতকাল সোমবারও তারা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার জেরে তেহরানে নিজেদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে আমিরাত।
দুবাইয়ে ছুটিতে এসেছিলেন রুশ পর্যটক আলেকজান্দ্রা ভাভিলোভা। তিনি জানান, অনেক চেষ্টার পর গতকাল রাতে তিনি একটি টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। তবে সেটি ইউরোপের নয়, মাসকাট থেকে শ্রীলঙ্কার কলম্বোগামী একটি ফ্লাইটের।
এদিকে মাসকাট থেকে প্রাইভেট জেটের ভাড়া বেড়েছে অনেক। ব্যাপক চাহিদা ও অস্থিতিশীল এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজের অভাবে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি।
মাসকাটভিত্তিক প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ‘জেটভিপ’ যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে জানায়, নেক্সট্যান্ট নামের খুব ছোট একটি জেটে করে ইস্তাম্বুল যাওয়ার খরচ এখন ৮৫ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা), যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিন গুণ। আবার মস্কোগামী প্রাইভেট চার্টার বিমানে একেকজন যাত্রীর সিটভাড়া পড়ছে ২০ হাজার ইউরো (প্রায় ২৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা)।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রাইভেট জেট কোম্পানি উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে।
রিয়াদ থেকে ইউরোপের ফ্লাইটের ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায়) গিয়ে ঠেকেছে।আমির ন্যারান, প্রধান নির্বাহী, ভিমানা প্রাইভেট জেটস
অস্ট্রিয়াভিত্তিক চার্টার প্রতিষ্ঠান অ্যালবাজেট জানিয়েছে, তাদের কাছে এখন খুব কম উড়োজাহাজ ফাঁকা আছে। ইউরোপে যাওয়ার জন্য প্রায় ৯০ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা) ভাড়া চাইছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিনিধি জানান, বিমা–সংক্রান্ত জটিলতা ও মালিকপক্ষের আপত্তিতে অনেক অপারেটর এখন ফ্লাইট পরিচালনা করতে চাইছে না। ফলে চাহিদা থাকলেও জোগানের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
আমিরাত ছাড়তে ইচ্ছুক অনেক যাত্রী ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে যাচ্ছেন। কারণ, রিয়াদ বিমানবন্দর এখনো সচল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফোর তথ্য অনুযায়ী, অনেক বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা ‘এসইউভি’ গাড়ির বহর ভাড়া করছে। এসব গাড়িতে করে গ্রাহকদের রিয়াদে পৌঁছে দেওয়ার পর সেখান থেকে প্রাইভেট ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তারা।
প্রাইভেট জেট ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ভিমানা প্রাইভেট জেটসের প্রধান নির্বাহী আমির ন্যারান বলেন, রিয়াদ থেকে ইউরোপের ফ্লাইটের ভাড়া সাড়ে ৩ লাখ ডলার (প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকায়) গিয়ে ঠেকেছে।
আমিরাত ছাড়তে ইচ্ছুক অনেক যাত্রী ১০ ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে যাচ্ছেন। কারণ, রিয়াদ বিমানবন্দর এখনো সচল রয়েছে।
এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে ইতালিতে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো গতকাল সরকারি উড়োজাহাজে করে দুবাই থেকে দেশে ফিরেছেন। ইতালির শত শত নাগরিক যখন দুবাইয়ে আটকা পড়ে আছেন, সে সময় মন্ত্রীর এভাবে ফিরে আসাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর সময় ক্রোসেতো সপরিবার দুবাইয়ে অবকাশ যাপন করছিলেন।
এ ঘটনায় রোমের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সংঘাতের আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সরকার কেন আগে থেকে সতর্ক ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। এমনকি তারা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।
দুবাইয়ে আমাদের রুমের চাবির মেয়াদ ৬ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর আগে পর্যটকদের পক্ষে জাহাজ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সপরিবার ফেরার পরিকল্পনা পরিবর্তন করে মন্ত্রী একাই ইতালিতে ফিরেছেন। তাঁর পরিবার এখনো দুবাই অবস্থান করছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিমানের খরচ তিনি নিজেই বহন করেছেন।
দ্য গার্ডিয়ানকে ক্রোসেতো বলেন, ‘আমি এখন আমার অফিসে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। হাজার হাজার মানুষের মতো আমিও সেখানে আটকে পড়েছিলাম। কিন্তু সেটা এখন বড় কোনো বিষয় নয়।’
তবে বেশির ভাগ পর্যটকের জন্য এখন দুবাইয়ে অবস্থান করা ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।
দুবাই পর্যটন বোর্ড স্থানীয় হোটেলগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। ফ্লাইট জটিলতার কারণে যেসব পর্যটক আরব আমিরাত ছাড়তে পারছেন না, তাঁদের হোটেল থেকে বের না করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আগের ভাড়াতেই তাঁদের থাকার মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু অনেক রুশ পর্যটক অনলাইনে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের হয় বাড়তি টাকা দিতে বলা হচ্ছে অথবা রিসোর্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যম টেলিগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একজন রুশ নারী বলেন, ‘আমাদের হোটেলের রিসেপশনিস্ট বুকিং এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন। তাঁর মতে, এটা তাঁদের সমস্যা নয়। ভিনদেশে আটকে পড়া মানুষের প্রতি এমন আচরণ সত্যি অমানবিক।’
ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বন্দরগুলো প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফলে হাজার হাজার পশ্চিমা পর্যটক এখন মাঝসমুদ্রে প্রমোদতরিতে আটকা পড়েছেন।
এ অঞ্চলের বিভিন্ন বন্দরের কাছে অন্তত ছয়টি বড় প্রমোদতরি নোঙর করেছে। এসব জাহাজের প্রতিটিতে হাজার হাজার যাত্রী আছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁদের জাহাজ থেকে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের ব্যালকনিতে না গিয়ে নিজ নিজ কেবিনে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে গত রোববার দুবাই ও শারজার শিল্পাঞ্চলে বিমান হামলার আগে ও পরের কিছু ছবি প্রকাশ পেয়েছে। আবুধাবির জায়েদ বন্দরে ইরানের ড্রোনের আঘাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর সেখান থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
মেইন শিফ-৪ নামের একটি জাহাজের পর্যটকেরা সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করেছেন। জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডকে তাঁরা জানান, তাঁদের ছুটির স্বর্গ নিমেষে রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় চরম আতঙ্কিত তাঁরা।
নেক্সট্যান্ট নামের খুব ছোট একটি জেটে করে ইস্তাম্বুল যাওয়ার খরচ এখন ৮৫ হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ টাকা), যা স্বাভাবিক সময়ের প্রায় তিন গুণ।
দুবাইয়ে আটকা পড়া এমএসসি ইউরিবিয়া জাহাজের যাত্রীরা জানিয়েছেন, তাঁদের রুমের চাবির মেয়াদ ৬ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর আগে পর্যটকদের পক্ষে জাহাজ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
আবুধাবির জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম নিয়ে গতকাল ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফ্লাইট ছাড়া, বাতিল হওয়া বা আবার কবে চালু হবে—এসব নিয়ে একেক রকম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকার ফ্লাইটরাডার২৪ জানায়, গতকাল বিকেলে অন্তত একটি যাত্রীবাহী বিমান আবুধাবি থেকে লন্ডনের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে।
দুবাইভিত্তিক আইনজীবী ইরিনা হিভার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, দুবাইয়ে তাঁর পরিচিতজনেরা এখন তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
প্রথম দল দ্রুত ওমান সীমান্তের দিকে ছুটছে। তাদের আশা, সেখান থেকে প্রাইভেট জেটে করে তারা ইস্তাম্বুলে যাবে। দ্বিতীয় দলটি জেদ ধরে আছে। তারা মনে করে, জীবন স্বাভাবিক নিয়মেই চলবে। তারা সমুদ্রসৈকতে সাঁতার কাটা, পাম জুমেইরাহতে সূর্যাস্ত দেখা আর রোদে শরীর এলিয়ে দিয়ে সময় কাটানোতেই বিশ্বাসী।
তৃতীয় দলটি সম্পর্কে হিভার লিখেছেন, তারা ‘আশ্রয়স্থলে অবস্থান-সংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা’ পালন করবে।