সৌদিতে হুতিদের হামলা, চার বছরের যুদ্ধবিরতির কি অবসান ঘটল

ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার পর ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ১৩ জুলাই ২০২৬, সানাছবি: এএফপি

ইয়েমেনে তাঁদের নিয়ন্ত্রিত একটি বিমানবন্দরে সৌদি আরব হামলা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ এনে দেশটির ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছেন হুতি বিদ্রোহীরা। এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার চার বছরের যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটল। হুতিরা ইরান-সমর্থিত।

সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের এক মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে হুতি গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি আরব।

হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাঁরা সৌদি আরবের আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিশানা করে হামলা চালিয়েছেন। তীব্র গরম থেকে বাঁচতে ইয়েমেন সীমান্তবর্তী পাহাড়ি ওই অঞ্চলটিতে অনেক সৌদি নাগরিক ঘুরতে যান।

২০২২ সালের মার্চে সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে হুতিদের হামলার পর একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। এরপর এই প্রথম সৌদির বিরুদ্ধে কোনো হামলার দায় স্বীকার করল গোষ্ঠীটি।

গত এপ্রিল মাসে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর সৌদির পূর্বাঞ্চল ও রিয়াদে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে এসেছিল। তবে সোমবারের এই সহিংসতার জেরে সৌদির দক্ষিণ সীমান্তে আবারও সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলো।

উপসাগরীয় অন্য ছোট দেশগুলোর তুলনায় সৌদি আরব আয়তনে বড় হওয়ায় যুদ্ধের ধকল তারা ভালোভাবেই সামলেছে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পূর্ব থেকে লোহিত সাগরের পশ্চিম উপকূলের পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি সচল রেখেছে দেশটি। তবে অতীতে লোহিত সাগরের জাহাজে হামলা চালানো হুতিদের সঙ্গে বড় কোনো সংঘাত তৈরি হলে, তা এই তেল রপ্তানির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার প্রতিবাদে হুতি সমর্থকেরা বিক্ষোভ করছেন। ১৩ জুলাই ২০২৬, সানা
ছবি: রয়টার্স

সৌদি যুবরাজকে ট্রাম্পের সবুজ সংকেত

মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে (এমবিএস) সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরব হুতিদের নিয়ে উদ্বেগের কথা যুক্তরাষ্ট্রকে জানায় এবং সম্ভাব্য হামলার জন্য সমর্থনের অনুরোধ করে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরদিন রুবিও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে কথা বলেন।

মার্কিন এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, এর পরপরই গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। ওই আলাপে মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের জন্য ট্রাম্পের সমর্থন চান এবং ট্রাম্প তা মঞ্জুর করেন।

ইরানি বিমান

এর আগে সোমবার ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী হুতিদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সৌদি আরব ইয়েমেনের সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে হুতিদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ হামলার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর অধ্যায় শেষ হলো।

একই সঙ্গে সানা বিমানবন্দরের ওপর থেকে ‘অবরোধ’ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বিমান সংস্থাগুলোকে সৌদির আকাশসীমা এড়িয়ে চলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেয় হুতিরা।

সানা বিমানবন্দরে চালানো হামলার দায় স্বীকার করেছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। রিয়াদের ব্যাপক সমর্থনপুষ্ট এই সরকারের অনেক সদস্যই রিয়াদে বসবাস করেন।

ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করা ইরানের মালিকানাধীন উড়োজাহাজ মহন এয়ার থেকে যাত্রীরা নামছেন। ১৩ জুলাই ২০২৬, ইয়েমেন
ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনি সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করা থেকে বিরত রাখতে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালানো হয়েছিল। তারা জানায়, ইয়েমেনের আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী যেকোনো বৈরী বিমানকে সরকারি বাহিনী ‘সব উপায়ে’ প্রতিহত করবে। এ জন্য ইরানকে দায়ী করেছে তারা।

পরবর্তী সময়ে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, উড়োজাহাজটি হুতি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদাহ বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে। সানা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত হোদেইদাহে বিমানটির অবতরণ ঠেকাতে কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

দীর্ঘদিনের যুদ্ধ আবার চাঙা

ইয়েমেনের আরেক মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, হুতিরা সানা বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) আরেকটি বিমানকে আটকে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে আইসিআরসির মুখপাত্র হাশেম ওসেইরান বলেন, রেডক্রসের সব কর্মী ও বিমানের ক্রুরা নিরাপদে আছেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতি এবং ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে আইসিআরসির মধ্যস্থতায় বন্দিবিনিময় চুক্তি ভেস্তে যায়। দুপক্ষই এ জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে, যা ক্রমবর্ধমান উত্তেজনারই ইঙ্গিত দেয়।

হুতিরা রাজধানী দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে দক্ষিণে পালিয়ে যেতে বাধ্য করার পর থেকে ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি শক্তির প্রক্সি যুদ্ধ চলছে।

২০১৫ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করে, যা বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের জন্ম দেয়।

গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সমর্থিত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দক্ষিণের অঞ্চলগুলো দখল করে নিলে সংঘাত আবার নতুন করে চাঙা হয়। এতে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য গঠিত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে ফাটল ধরে। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ইরান যুদ্ধ চলাকালে লোহিত সাগরের বহু জাহাজে হুতিদের হামলা সত্ত্বেও ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিটি অনেকটাই বজায় ছিল।