ইরান কীভাবে একই দিনে দুই মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক মাসের বেশি সময় ধরে বিধ্বংসী বিমান হামলা সত্ত্বেও ইরানি সামরিক বাহিনী এখনো নাছোড়বান্দা শত্রু হিসেবে টিকে আছে।
ইরানের বাহিনী দুটি মার্কিন সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। গত ২০ বছরেও এমন আঘাতের শিকার হয়নি মার্কিন যুদ্ধবিমান। এটি প্রমাণ করে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ‘পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে’ বলে দাবি করলেও দেশটির পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা এখনো রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ইরান আক্রমণের পাঁচ সপ্তাহ পর এসব হামলা হলো। অথচ এ সপ্তাহের শুরুতেই ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরানের ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে’।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরান গতকাল শুক্রবার একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। একজন সেনাসদস্যকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও দ্বিতীয় সদস্যের খোঁজে তল্লাশি চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে একটি মার্কিন এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানি সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা এখনো একটি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়ে গেছে।
ইরান যেভাবে মার্কিন বিমান লক্ষ্যবস্তু বানাল
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোতে আঘাত করা ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রথাগত রাডার ট্র্যাকিংয়ের বদলে অপটিক্যাল ও ইনফ্রারেড (আইআর) সেন্সরের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করেছে।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোতে উচ্চমাত্রার থার্মাল ইমেজ (তাপীয় ছবি) দেখা গেছে, যা সাধারণত ইলেকট্রো-অপটিক্যাল/ইনফ্রারেড (ইও/আইআর) ট্র্যাকিং সিস্টেমের বৈশিষ্ট্য।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি নিখুঁত হামলায় ইরানের বেশির ভাগ রাডারচালিত ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা সম্ভবত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাই ইরান এখন প্যাসিভ সেন্সরের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করছে, যা বিমানের ইঞ্জিনের তাপ ও বাতাসের ঘর্ষণে তৈরি হওয়া তাপ শনাক্ত করতে পারে।
একটি ইনফ্রারেড সিস্টেম রাডার ছাড়াই ইঞ্জিনের বিকিরিত তাপ শনাক্ত করে বিমানের ওপর লক্ষ্য স্থির করে। অপারেটর লঞ্চারটিকে ততক্ষণ লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধরে রাখেন, যতক্ষণ না থার্মাল সিকারটি আকাশের শীতল অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী তাপ শনাক্ত করতে পারে। একবার লক হয়ে গেলে, সিস্টেমটি সেই চলমান তাপের উৎসকে অনুসরণ করে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে নিখুঁতভাবে পরিচালিত করে।
মজিদ ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার ভূমিকা
এসব হামলায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘মজিদ’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহৃত হতে পারে। মজিদ (এডি ০৮) হলো ইরানের স্বল্পপাল্লার এবং কম উচ্চতায় কাজ করা একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা ২০২১ সালের এপ্রিলে উন্মোচন করা হয়েছিল।
এটি ‘আরাস-২’ নামের ট্যাকটিক্যাল যানের ওপর বসানো থাকে। এটি নিচু দিয়ে ওড়া বিমান, হেলিকপ্টার, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংসে কাজ করে। এ ব্যবস্থা কোনো রাডার সিগন্যাল ছাড়াই ১৫ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে পারে, যা একে শত্রুর চোখে অদৃশ্য ও নিরাপদ রাখে।
প্রতিটি ৭৫ কেজির এডি-০৮ ক্ষেপণাস্ত্র ৭০০ মিটার থেকে ৮ কিলোমিটার দূরত্বের এবং ৬ কিলোমিটার উচ্চতার লক্ষ্যবস্তুকে ‘ম্যাক ২’ গতিতে আঘাত করতে পারে। ধারণা করা হয়, এটি একসঙ্গে চারটি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আঘাত করতে সক্ষম।
কেন এটি মার্কিনদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ
এফ-১৫ই বাএ-১০-এর মতো যুদ্ধবিমানকে ইনফ্রারেড বা ইলেকট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর দিয়ে ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কারণ, এসব বিমান অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন, কৌশলী এবং এদের উন্নত আত্মরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।
আবার আধুনিক যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিনে তাপ কমানোর নজেল এবং বিশেষ কোটিং থাকে, যা তাদের তাপীয় অস্তিত্ব কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া কুয়াশা বা খারাপ আবহাওয়ায় ইলেকট্রো-অপটিক্যাল ক্যামেরা খুব একটা কার্যকর হয় না। যুদ্ধবিমান থেকে ছোড়া ‘ফ্লেয়ার’ (একধরনের অগ্নিপিণ্ড) ক্ষেপণাস্ত্রের মাথাকে বিভ্রান্ত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
ইরান সম্ভবত তখনই সফল হয়েছে, যখন এসব বিমান খুব কাছাকাছি এবং কম উচ্চতায় অবস্থান করছিল। অর্থাৎ যখন বিমানের পাল্টা ব্যবস্থাগুলো ফুরিয়ে গিয়েছিল বা পাইলটরা অন্যমনস্ক ছিলেন—এমন সংক্ষিপ্ত মুহূর্তকে কাজে লাগিয়েই ইরান এই বিরল সাফল্য পেয়েছে।
এত দিন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল, ইরানি আকাশসীমায় তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। গতকাল শুক্রবার ইরানের আকাশে একটি মার্কিন এফ-১৫ই ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা তাদের সেই দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল।
কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন জোটের ব্যাপক অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো সত্ত্বেও ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শত্রুর সীমানার গভীরে ঢুকে উন্নত যুদ্ধবিমানকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে।