ইরানের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন টাস্কফোর্স, এবার স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগরে নজর
ইরানের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বন্ধে এবার স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগরকে লক্ষ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির এসব পথে উন্নত অস্ত্র, বিস্ফোরক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধে ‘টাস্কফোর্স আয়রন গেট’ নামে বিশেষ বাহিনী গঠন করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
গত শনিবার এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি ইরানের অবৈধ আয়ের উৎসগুলোও বন্ধ করার লক্ষ্য রয়েছে এই উদ্যোগে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাস্কফোর্স আয়রন গেটের সদর দপ্তর হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার টাম্পায়। এটি মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। অস্ত্র পরিবহন বন্ধের পাশাপাশি ইরানের ব্যবহৃত দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির সরবরাহ ঠেকানোও হবে এর কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে সরকারের অন্যান্য সংস্থার সমন্বয় থাকবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই কার্যক্রমে অর্থ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও যুক্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টাস্কফোর্স আয়রন গেটের সদর দপ্তর হবে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার টাম্পায়। এটি মার্কিন সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। অস্ত্র পরিবহন বন্ধের পাশাপাশি ইরানের ব্যবহৃত দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তির সরবরাহ ঠেকানোও হবে এর কাজ।
সাতটি দেশের সঙ্গে ইরানের স্থলসীমান্ত রয়েছে। এসব সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কিলোমিটার (৩ হাজার ৬৬০ মাইল)। দেশটির পশ্চিম ও উত্তরে রয়েছে ইরাক, তুরস্ক, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। আর পূর্বে রয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান।
এ ছাড়া কাস্পিয়ান সাগরের সঙ্গেও ইরানের উপকূল রয়েছে। সেখানে দেশটির উপকূলরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫০ কিলোমিটার (৪৭০ মাইল)।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আট মাসের বেশি সময় পরও তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর নতুন উপায় খুঁজছে ওয়াশিংটন। মার্কিন হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি ও আরব সাগর দিয়ে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও ইরান এখনো এই অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটির শাসকেরাও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে সেন্টকমের সহযোগিতা জোরদার হলে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন, অস্ত্র কারখানা পুনর্গঠন এবং সামরিক সরঞ্জামের মজুত পুনরায় পূরণ করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা আরও সীমিত হবে।
সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাব অনুযায়ী, নৌ অবরোধের কারণে ইরানের ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ হয়েছে।
ইরানের গোপন নেটওয়ার্ক
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী যানবাহন আমদানির জন্য গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে কার্গো বিমানে এসব সরঞ্জাম ইরানে প্রবেশ করেছে। ফলে নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিভিন্ন পথে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে তেহরান।
রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী যানবাহন আমদানির জন্য গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে।
নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর উল্লাস প্রকাশ করেছে ইরান। নির্বাচনের ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির জন্য ইরান যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়া আদৌ সঠিক সিদ্ধান্ত কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যস্থতাকারীরা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে-এমন আশঙ্কা থেকে এই প্রচেষ্টা জোরদার হয়েছে।
ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি দিয়ে আসছেন। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোয় ব্যাপক পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে।
রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর নতুন করে হামলা চালালেও তেহরানের আলোচনার অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। এমনকি এতে ইরানের সরকারের পতনও ঘটবে না।