ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’ নিয়ে গাজাবাসী কী ভাবছে
গাজাবাসীর কাছে ‘শান্তি’ এখন শারীরিক বা মানসিক—উভয় অর্থেই সুদূরপরাহত এক বিষয়। গত ১০ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে প্রায়ই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গত তিন মাসে নতুন করে ৪৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
শুধু হামলা নয়, অবরোধ আর বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার জনজীবন বিপর্যস্ত। এমন ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ‘দ্বিতীয় ধাপ’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, এই ধাপের লক্ষ্য হলো গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ, একটি দক্ষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পুনর্গঠন শুরু করা।
এই নতুন ব্যবস্থায় একটি ফিলিস্তিনি ‘টেকনোক্র্যাট’ (বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত) প্রশাসন থাকবে, যা তদারকি করবে আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড। এই বোর্ডের প্রধান হিসেবে থাকবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
কাগজে–কলমে ভালো হলেও বাস্তবে সংশয়
কাগজে-কলমে এই পরিকল্পনা শুনতে ভালো মনে হলেও গাজার মানুষের মনে রয়েছে গভীর সংশয়। কারণ, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তারা যে ভয়াবহ হামলা ও ধ্বংসলীলা দেখেছে, তাতে তারা কোনো কিছুকেই সহজে বিশ্বাস করতে পারছে না।
গাজা সিটির সাংবাদিক ও লেখক আরওয়া আশুর বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের অনেক সিদ্ধান্তই গাজার বাস্তবতার চেয়ে অনেক দূরে। আমাদের প্রতিদিন কাটে অবরোধ, ভয়, মৃত্যু আর তাঁবুর ভেতর। যখনই কষ্টের লাঘব করার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাতে বাধা দেয়।’
আশুর আরও বলেন, ‘মানুষ আগের মতো স্কুল, হাসপাতাল আর অবাধে যাতায়াতের সুযোগ চায়। যদি এই ‘শান্তি বোর্ড’ এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে, তবে আমরা একে স্বাগত জানাই। কিন্তু তারা যদি তা না পারে, তবে এর লাভ কী?’
ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়ে কি সমাধান সম্ভব
দীর্ঘ ১৮ বছরের হামাস শাসন এবং দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর গাজার মানুষ পরিবর্তন চায়। তবে তারা চায় নিজেদের ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেরা অংশ নিতে, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজ সামলাবে সাবেক উপমন্ত্রী আলী শাথের নেতৃত্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি কমিটি। তবে এই কমিটির ওপর নজরদারি করবে ‘শান্তি বোর্ড’, যার নেতৃত্বে থাকবেন বুলগেরিয়ার সাবেক মন্ত্রী নিকোলে ম্লাদেনভ। ম্লাদেনভ অভিজ্ঞ কূটনীতিক হলেও তিনি ইসরায়েলের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন বা ফিলিস্তিনিদের অধিকার কতটা রক্ষা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
মানবাধিকারকর্মী মাহা হুসাইনি বলেন, ‘গাজায় যাদের জীবন সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত, তাদের বাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই হলো সেই পুরোনো শাসনকাঠামো ফিরিয়ে আনা, যা এই দখলদারত্ব আর গণহত্যাকে প্রশ্রয় দিয়েছে।’
রাজনৈতিক জটিলতা
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ ফাইয়াদ মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে ম্লাদেনভ বা এই শান্তি বোর্ডের মডেল মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কারণ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) বা আরব দেশগুলোর কেউ এখন এই চুক্তি নষ্ট করতে চায় না। তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইসরায়েলও চায় না গাজা কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাক। ফাইয়াদ বলেন, ‘ইসরায়েল চায় গাজা যেন শুধু একটি অস্ত্রহীন এলাকা হয়ে থাকে এবং সেখানকার মানুষ রাজনৈতিক অধিকারের কথা ভুলে গিয়ে শুধু প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়েই ব্যস্ত থাকে।’
গাজার বর্তমান জীবন
গাজা সিটির ৩০ বছর বয়সী কম্পিউটার প্রোগ্রামার সামি বালুশা বলেন, তাঁর কাছে শান্তির মানে খুব সহজ—রাতে নিরাপদে ঘুমানো এবং সকালে সুস্থভাবে বেঁচে থাকা। যুদ্ধের কারণে তাঁকে ১৭ বার ঘরবাড়ি বদলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালাতে হয়েছে।
সামি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনে না। আমার ভয় হয়, আগামী প্রজন্ম হয়তো এই নরকতুল্য জীবনটাকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেবে। মানুষ এখন বড্ড ক্লান্ত। তারা শুধু এই দুর্দশার অবসান চায়, তা যেভাবেই হোক।’