সোমবার থেকে সব ইরানি বন্দর অবরুদ্ধ করার হুমকি মার্কিন বাহিনীর

ওমানের মুসান্দাম প্রদেশের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত একটি জাহাজ। ১২ এপ্রিল ২০২৬ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আজ সোমবার থেকে ইরানের সব বন্দর অবরোধ করার হুমকি দিয়েছে। পাকিস্তানে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদলের মধ্যকার শান্তি আলোচনা শেষ হওয়ার পর তেহরানের ওপর চাপ তৈরির নতুন পদক্ষেপ হিসেবে এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গত রোববার সন্ধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) একটি বিবৃতি দিয়েছে। তারা বলেছে, ১৩ এপ্রিল পূর্বাঞ্চলীয় সময় সকাল ১০টা (গ্রিনিচ মান সময় বেলা ২টা) থেকে ইরানের বন্দরে প্রবেশ এবং সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া সব নৌযানের ক্ষেত্রে এ অবরোধ প্রযোজ্য হবে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যেকোনো দেশের নৌযানই ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করুক না কেন, সবার ক্ষেত্রেই এ নিষেধাজ্ঞা থাকবে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোও এর আওতাভুক্ত থাকবে।

তবে সেন্টকম বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেসব জাহাজ ইরানের বাইরের কোনো বন্দর থেকে আসছে বা সেখানে যাচ্ছে, তাদের নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় মার্কিন বাহিনী কোনো বাধা দেবে না।’

সেন্টকমের ঘোষণাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের দেওয়া হুমকি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প পুরো হরমুজ প্রণালি অবরোধ এবং ইরানকে টোল দেওয়া জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল–জাজিরার সংবাদকর্মী হেইডি ঝৌ-কাস্ত্রো বলেছেন, ‘এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।’ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা ‘সাংঘর্ষিক তথ্যের’ দিকেও ইঙ্গিত করেছেন।

হেইডি ঝৌ-কাস্ত্রো বলেন, ‘ট্রাম্প বলেছিলেন, এই অবরোধ হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবেশ বা বের হওয়া সব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে। কিন্তু সেন্টকম বলছে, এটি শুধু ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকেই নিশানা করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের হুমকির পর মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল অনেকটাই কমে গেছে। এতে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছে।

ইরান এখন শুধু নিজেদের জাহাজগুলোকে এ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে দিচ্ছে। পাশাপাশি অন্য দেশের কিছু জাহাজকে সীমিতভাবে চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হলে হরমুজ প্রণালিতে একটি টোলব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আলোচনা করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।

এদিকে ট্রাম্পের অবরোধের হুমকির জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, কোনো সামরিক জাহাজ এগিয়ে এলে তা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করবে। ২২ এপ্রিল পর্যন্ত এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা। এ ধরনের জাহাজকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার হুমকি দিয়েছে তারা।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হওয়া আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অবরোধের ঘোষণা আবারও সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

ইরানের কর্মকর্তারা চুক্তি না হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, মার্কিন আলোচকেরা তাঁদের লক্ষ্য পরিবর্তন করেছেন। যখন একটি সমঝোতা স্মারক প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল, তখন তাঁরা আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করেছেন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জোহরে খারাজমি বলেছেন, কীভাবে আচরণ করতে হবে বা কোন কোন জাহাজকে চলাচল করতে দিতে হবে, তা ইরানিদের ঠিক করে দেওয়ার মতো অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র নেই।

খারাজমি আরও বলেন, ইরান দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

খারাজমি মনে করেন, প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। হলিউড ধাঁচের কৌশল দিয়ে তারা এই যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হতে পারবে না।