ইউটিউবে সৌদি যুবরাজের সমালোচনা করে যুক্তরাজ্যে প্রাণহানির শঙ্কায় দিন কাটে আরব তরুণের

ঘানেম আল-মাসারিছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট

সাত বছর আগের কথা। সৌদি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ইউটিউবার ও কমেডিয়ান ঘানেম আল-মাসারিরের জনপ্রিয়তা তখন তুঙ্গে। বিপুলসংখ্যক মানুষ ইউটিউবে তাঁর ভিডিও দেখত।

যুক্তরাজ্যের ওয়েম্বলি এলাকার এই বাসিন্দা সৌদি রাজপরিবারের তীব্র সমালোচনা করে ভিডিও বানাতেন এবং সেগুলো ইউটিউবে দিতেন। এতে যেমন তাঁর ভক্তসংখ্যা বেড়েছিল, তেমনি আবার শত্রুদের পাল্লাও ভারী হয়েছিল।

একসময় মাসারির খেয়াল করেন, তাঁর মোবাইল ফোনগুলো অস্বাভাবিকভাবে ধীরগতিতে কাজ করছে। ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এরপর এই সৌদি বংশোদ্ভূত ইউটিউবার লন্ডনের বিভিন্ন জায়গায় বারবারই একই মানুষদের তাঁর আশপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখেন।

সৌদি সরকারের সমর্থক বলে মনে হওয়া কিছু লোক মাসারিরকে রাস্তায় থামিয়ে হয়রানি করতে থাকে এবং ভিডিও ধারণ করে। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—সব সময় তিনি কোথায় আছেন, তা তারা জানল কীভাবে?

ঘানেম আল-মাসারি
ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট

আল মাসারিরের আশঙ্কা ছিল, তাঁর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তাঁর ওপর গোপনে নজরদারি চালানো হচ্ছে। পরে সাইবার বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেন, পেগাসাস নামের একটি হ্যাকিং টুল ব্যবহার করে তাঁর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালানো হয়েছে।

আল–মাসারির বিবিসিকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার কল্পনার বাইরে ছিল। তারা আপনার অবস্থান জানতে পারছে, ফোনের ক্যামেরা চালু করতে পারছে, মাইক্রোফোন চালু করে আপনার কথা শুনতে পারছে। আপনার সব তথ্য, সব ছবি—সবকিছুই তারা হাতে পেয়ে যাচ্ছে।’

ছয় বছরের আইনি লড়াইয়ের পর গত সোমবার লন্ডনের হাইকোর্ট এ ঘটনায় সৌদি আরবকে দায়ী ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন। আল–মাসারিরকে ৩০ লাখ পাউন্ডের (প্রায় ৪১ লাখ ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সৌদি সরকারকে বলা হয়েছে।

২০১৮ সালে আল–মাসারিরের আইফোন হ্যাক করা হয়েছিল। তিনি তাঁর কাছে আসা তিনটি খুদে বার্তায় থাকা লিংকে ক্লিক করার পর ফোনটি হ্য্যাক হয়ে যায়। বার্তাগুলো দেখে মনে হয়েছিল, এগুলো সংবাদমাধ্যম থেকে পাঠানো বিশেষ সদস্যপদের প্রস্তাব।

ফোন হ্যাক হওয়ার পর আল–মাসারির নিয়মিত নজরদারি, হয়রানি এবং হুমকির শিকার হন। সেই বছরের আগস্টে তাঁকে লন্ডনে মারধরের শিকার হতে হয়।

লন্ডনের হাইকোর্টে শুনানিতে বলা হয়, দুই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি আল–মাসারিরের কাছে গিয়ে চিৎকার করতে থাকেন এবং জানতে চান, সৌদি রাজপরিবার নিয়ে তিনি কথা বলার কে? এরপর তাঁরা তাঁর মুখে লাথি–ঘুষ মারতে শুরু করেন এবং ক্রমাগত আক্রমণ চালান।

পথচারীরা হস্তক্ষেপ করলে ওই দুই ব্যক্তি পিছিয়ে যান। তাঁরা আল–মাসারিরকে ‘কাতারের দাস’ বলে ডাকছিলেন এবং বলছিলেন, তাঁরা তাঁকে ‘শিক্ষা দেবেন’।

হাইকোর্টের বিচারক এই শারীরিক হামলাকে পূর্বপরিকল্পিত বলে উল্লেখ করেছেন।

বিচারক সাইনি তাঁর লিখিত রায়ে বলেছেন, সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ বা তাদের প্রতিনিধিরা যে এ হামলার নির্দেশ বা অনুমোদন দিয়েছে, সে ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ আছে।

বিচারক রায়ে আরও উল্লেখ করেছেন, আল–মাসারিরকে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

সেই হামলাই শেষ নয়। এরপরও হয়রানি চলতে থাকে। ২০১৯ সালে কেনসিংটনের এক ক্যাফেতে একটি শিশু আল–মাসারিরের কাছে এসে বাদশাহ সালমানের প্রশংসা করে গান গায়।

এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। নিজস্ব হ্যাশট্যাগের ট্রেন্ডিং হয় এবং সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও তা প্রচার করা হয়।

একই দিনে, পশ্চিম লন্ডনের একটি রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার সময় এক ব্যক্তি আল–মাসারিরের কাছে এসে বলেন, ‘তোমার দিন শেষ হতে চলেছে।’ তারপর তিনি চলে যান।

আল–মাসারিরের জন্ম সৌদি আরবে হলেও তিনি ২০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তিনি মূলত পোর্টসমাউথে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন।

আল–মাসারির এখন ব্রিটিশ নাগরিক এবং ওয়েম্বলিতে থাকেন। তবে এখন আর তাঁর দূরে যাওয়া হয় না। এখন মধ্য লন্ডনে যাওয়াটাও তাঁর জন্য ভয়ের। কারণ, আগে তাঁকে সেখানে হামলার শিকার হতে হয়েছে।

৪৫ বছর বয়সী আল–মাসারির আরবভাষী বিশ্বে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক ইউটিউব ভিডিওগুলোর জন্য বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। সেখানে তিনি সৌদি শাসক, বিশেষ করে যুবরাজ ও কার্যত শাসক মোহাম্মদ বিন সালমানের সমালোচনা করতেন।

আল–মাসারির হাস্যরসাত্মক ভিডিওগুলো প্রায়ই ভাইরাল হতো এবং এগুলো ৩৪ কোটি ৫০ লাখের বেশি ভিউ পেয়েছে।

মাসারির সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিডিওটি ১ কোটি ৬০ লাখ ভিউ হয়েছে। সেখানে তিনি সৌদি আরবে মেয়েদের নাচের একটি ভাইরাল ভিডিও নিয়ে ক্ষুব্ধ হওয়া সৌদি কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেছেন। রহস্যজনকভাবে ইউটিউবে সেই ভিডিওর শব্দ ফেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ আল–মাসারির জানেন না, কখন বা কীভাবে ভিডিওটি সম্পাদিত হয়েছে।

হ্যাকিং ও হামলার শিকার হওয়ার পর থেকে আল–মাসারির আত্মবিশ্বাস হারিয়েছেন। তিনি হতাশ ও ভীত হয়ে পড়েছেন। এই ব্যক্তি বিবিসির সঙ্গে খুব সীমিত আকারে কথা বলেছেন এবং পুরোপুরি মুখ দেখাতে রাজি হননি।

মাসারির তিন বছর ধরে কোনো ভিডিও পোস্ট করেননি।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে সিটিজেন ল্যাবের স্পাইওয়্যার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আল–মাসারির ফোনটি পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে হ্যাক করা হয়েছে। তাঁরা একজন বিশ্লেষককে লন্ডনে পাঠিয়েছিলেন। হ্যাকটি সৌদি আরবের নির্দেশে করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।

পেগাসাস হলো একটি শক্তিশালী ও বিতর্কিত হ্যাকিং টুল। ইসরায়েলের এনএসও গ্রুপ এটি তৈরি করেছে। এনএসও গ্রুপের দাবি, সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধীদের ওপর নজরদারি চালাতে তারা এটি শুধু বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছে বিক্রি করে।

তবে সিটিজেন ল্যাব দেখিয়েছে, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং বিরোধীদের ফোনে এই পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে।

লন্ডনের হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, সৌদি কর্তৃপক্ষকে মোট ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৬৬২ পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। তবে সৌদি আরব তা পরিশোধ করবে কি না, সেটি নিশ্চিত নয়।

বিবিসি এ ব্যাপারে জানতে লন্ডনস্থ সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

আল–মাসারির বলেছেন, তিনি রায় কার্যকর করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে প্রস্তুত। তবে তিনি মনে করেন, হ্যাকিংয়ের কারণে তিনি যে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তা কোনো অর্থ দিয়েই পরিশোধ করা সম্ভব নয়।