১০ দিনের মধ্যে চুক্তি না করলে ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের

আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুততার সঙ্গে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, এই প্রস্তুতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চাইলে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই ইরানে হামলা চালাতে পারে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেহরানকে ১০ দিন সময় বেঁধে দিয়েছেন। এর মধ্যে চুক্তি না হলে ইরানে হামলার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

 পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যদি হামলা চালানো হয়, তাহলে তা কীভাবে চালানো হবে, সে ইঙ্গিত দেননি প্রেসিডেন্ট  ট্রাম্প। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলতি সপ্তাহে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বাড়ানো হয়েছে, তাতে চাইলে তাঁরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেণপকেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারবেন।

 ট্রাম্পের মূল মাথাব্যথা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে। তিনি বারবার বলেছেন, তেহরানকে পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে, ইউরেনিয়ামও সমৃদ্ধ করতে দেওয়া হবে না। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে অগ্রগতির কথা জানিয়েছিল দুই পক্ষ। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে মার্কিন কর্মকর্তাদের।

পরে বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে গাজা বোর্ড অব পিসের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, গত বছর ইরানের তিনটি পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা না চালালে, তেহরানের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত করত। যুক্তরাষ্ট্রকে হয়তো এখন আরও এক ধাপ এগোতে হবে। না–ও হতে পারে। হয়তো একটি চুক্তি হবে। আগামী ১০ দিনের মধ্যেই সম্ভবত তা জানা যাবে। 

 পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চায় ইরান। তেহরান তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল। তবে গত বছরের জুনে ইরান–ইসরায়েল সংঘাত শুরু হলে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। ওই সময়েই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: এএফপি

 বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান সমাবেশ

 মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও ক্রুজার যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং ৫০টির বেশি যুদ্ধবিমান রয়েছে। এ ছাড়া দ্রুততার সঙ্গে সেখানে আরও কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহের ট্যাংকার পাঠিয়েছে মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের আটটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে।

 এসব ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করা রয়েছেন। মূলত এসব ঘাঁটির কারণেই ট্রাম্পের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গত জানুয়ারিতে ইরানের বিক্ষোভের সময় দেশটিতে হামলা চালাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, তখন ঘাঁটিগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল ছিল। সে সময় ইরানের পাল্টা হামলা চালালে ঘাঁটিগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা ছিল।

 তবে গত মাসে প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে পারে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থাগুলো সাময়িক সময়ের জন্য ইরানের হাত থেকে ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দেবে। দীর্ঘ মেয়াদে সংঘাত বাধলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের এফ–৩৫, এফ–২২ ও এফ–১৬–এর মতো যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের পথে ছিল। বড় পরিসরে হামলা চালানোর জন্য সেখানে জ্বালানি সরবরাহের উড়োজাহাজও নেওয়া হয়েছে। গত বছর ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের বি–২ বোমারু বিমানগুলোকেও উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

 যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিশেষজ্ঞ ভালি নাসর বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে হামলার প্রস্তুতির জন্য আরও সময় পাবে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে প্রতিশোধমূলক হামলার পরিকল্পনা সাজিয়ে নিতে পারবে তেহরান। আর শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায়, তার জন্য ওয়াশিংটনকে যে মূল্য দিতে হবে, তা বিবেচনায় রাখতে হবে ট্রাম্পকে।

 যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলও

 ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে তৎপর হয়েছে ইসরায়েলও। তেহরান ও ওয়াশিংটনের চলমান বৈঠকের মধ্যেই সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে গিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি চান ইসরায়েলের ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা কমাতে পদক্ষেপ নিক যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি কোনো যুদ্ধ শুরু হলে তাতেও অংশ নিতে পারে ইসরায়েল।

 বিষয়টি নিয়ে জানাশোনা আছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত এমন দুই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। তবে তা আগামী রোববার পর্যন্ত পেছানো হয়েছে।

 যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের ওই দুই কর্মকর্তা। তাঁদের ভাষ্যমতে, ইসরায়েল কিছু পরিকল্পনা প্রস্তুত করে রেখেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়েক দিনের মধ্যে তীব্র হামলা চালিয়ে ইরানকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। যেন দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনায় ছাড় দিতে রাজি হয়।