দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান কঠিন করে তুলছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুফাইল ছবি: রয়টার্স

পশ্চিম তীরে জমি দখলে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহায়তা করতে পদক্ষেপ নিয়েছে ইসরায়েল। এ ভূখণ্ডের যেসব অংশে ফিলিস্তিনিদের কিছুটা হলেও স্বশাসন রয়েছে, সেখানে ইসরায়েলিদের ক্ষমতা বাড়াতে তৎপরতা শুরু করা হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো ইসরায়েল–ফিলিস্তিন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বলে আখ্যা দিয়েছেন ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণার ওপর সর্বশেষ আঘাত। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের এই রূপকল্প ১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অসলো চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এ সমাধানের পথে বাধা বেড়েছে। ফলে দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা।

ইসরায়েলের নতুন সিদ্ধান্তগুলো কী

পশ্চিম তীরের জমির গোপন দলিলগুলো সামনে আনার মাধ্যমে বসতি স্থাপনকারীদের সেখানে জমি দখলের গতি বাড়াবে ইসরায়েল। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে জমি কেনা-সংক্রান্ত জর্ডানের একটি আইন বাতিল করা হবে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত পশ্চিম তীর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

অসলো চুক্তিতে পশ্চিম তীরকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—তিন অংশে ভাগ করা হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘এ’ ও ‘বি ’ অংশে ‘তদারকি ও আইন প্রয়োগমূলক পদক্ষেপ’ বাড়াবে ইসরায়েল। ‘এ’ অংশে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ‘বি’ অংশে তারা বেসামরিক বিষয়গুলো পরিচালনা করে। তবে নিরাপত্তা ইসরায়েলের হাতে। আর ‘সি’ অংশে ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

আরব–ইসরায়েলের ছয় দিনের যুদ্ধের সময় সিনাই উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া সাঁজোয়া যান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের শুরু কোথায়

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে আরব ও ইহুদি রাষ্ট্রে ভাগ করার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। ইহুদিরা ভূখণ্ডের ৫৬ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন। আরব লিগ তখন এটি প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। এর এক দিন পর পাঁচটি আরব দেশ ইসরায়েল আক্রমণ করে। যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, ইসরায়েল ৭৭ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে।

পরে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এবং মিসরের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় ইসরায়েল। সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও ইসরায়েলের দখল করা ভূখণ্ডে প্রায় ৯০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী হিসেবে বসবাস করছেন। আরও ২০ লাখ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নাগরিক হিসেবে দেশটিতে বাস করছেন।

ব্যর্থ যত প্রচেষ্টা

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত অসলো চুক্তিতে সই করেছিলেন। এই চুক্তিতে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার ও সহিংসতা ত্যাগের কথা বলা হয়েছিল। ফিলিস্তিনিরা আশা করেছিল, এটি পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে একটি পদক্ষেপ হবে।

কিন্তু উভয় পক্ষ থেকেই এই প্রক্রিয়া একাধিকবার হোঁচট খেয়েছে। ২০০৭ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গাজা দখল করে নেয় হামাস। এর আগে ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে ক্যাম্প ডেভিডে নিয়ে আসেন। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এর প্রধান বাধা ছিল জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ।

পশ্চিম তীরের রামাল্লার কাছে ইসরায়েলের নতুন অবৈধ বসতি
ফাইল ছবি: রয়টার্স

আজ বাধাগুলো কতটা জটিল

২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের প্রত্যাহার করলেও পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি সম্প্রসারিত হয়েছে। ইসরায়েলি সংস্থা পিস নাউর মতে, এই বসতি স্থাপনকারীদের সংখ্যা ১৯৯৩ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে বেড়ে তিন দশক পর ৭ লাখে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এটি একটি কার্যকর রাষ্ট্রের ভিত্তি নষ্ট করছে।

২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত। এ সরকারের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদীরা বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থন দিয়ে থাকেন। তাঁদের ভাষ্য, ফিলিস্তিনি জাতি বলে কিছু নেই।

আরও পড়ুন