ট্রাম্প তাঁর বড় জুয়াটি খেললেন

ডোনাল্ড ট্রাম্পছবি: এএফপি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি পর্ষদ) যুগের প্রথম যুদ্ধ শুরু হলো। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের শাসক পরিবর্তনের চেষ্টা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই যুদ্ধের কোনো আইনি ভিত্তি নেই। কংগ্রেস বা মার্কিন জনগণের সঙ্গে সামান্যতম আলোচনা ছাড়াই শুরু হয়েছে এই হামলা। আর তা হয়েছে সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলার মধ্যে।

গতকাল শনিবার প্রথম দফা বোমাবর্ষণের পর রেকর্ড করা আট মিনিটের একটি ভাষণ নিয়ে আসেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে এই হামলা তেহরানকে আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকারে বাধ্য করার মধ্যে সীমিত থাকার নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনী (আইআরজিসি) আত্মসমর্পণ না করলে তাদের হত্যা করা হবে। একই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও নৌবাহিনী ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

এরপর ইরানের বিরোধী দল এবং দেশটির জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য বিদ্রোহ করার এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করার পথ প্রশস্ত করা হবে। ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সব মানুষের জন্য—পার্সিয়ান, কুর্দি, আজেরি, বালুচ ও আখভাক—স্বৈরাচারের বোঝা ঝেড়ে ফেলে একটি মুক্ত ও শান্তির ইরান গড়ে তোলার সময় এসেছে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুহূর্তের সঙ্গে মিল রেখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠী থেকে সৃষ্ট অস্তিত্বের হুমকি দূর করতে’ তাঁর দেশ এই যুদ্ধে যোগ দিয়েছে।

যেসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য সামনে রেখে এই যৌথ হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর কারণে গত কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলা আলোচনার সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সম্ভাব্য সীমা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। গত বৃহস্পতিবারের সর্বশেষ দফার সেই আলোচনা চলেছিল ট্রাম্পের ভাষায় মধ্যপ্রাচ্যে জড়ো হওয়া ‘বিউটিফুল আর্মাদা’র (চমৎকার নৌবহর) ছায়াতলে। ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর এটিই ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর বৃহত্তম সামরিক প্রস্তুতি। এখন মনে হচ্ছে, ইরানের পুরোপুরি আত্মসমর্পণই কেবল যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তি প্রদর্শন থামাতে পারত।

ট্রাম্প দীর্ঘকাল ধরে ইরাক যুদ্ধের মূর্খতার বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। তিনি বিদেশে মার্কিন সামরিক অভিযান শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুবার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন এবং আটটি যুদ্ধ শেষ করার (যা তথ্যগতভাবে বিতর্কিত) দাবির ভিত্তিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য জোরালো লবিং করেছেন।

যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১০ দিন আগে ট্রাম্প তাঁর শান্তি পর্ষদের উদ্বোধনী সভার আয়োজন করেছিলেন। মনে করা হয়, এ পর্ষদের লক্ষ্য কেবল মধ্যপ্রাচ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে দ্বন্দ্ব নিরসন করা। ওই সভায় ২৭টি দেশের (যাদের বেশির ভাগই স্বৈরাচারী) নেতা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনে জড়ো হয়ে শান্তিদূত হিসেবে ট্রাম্পের প্রশংসা করেন।

ওই সভায় এই নেতারা ২৩ বছর আগের ইরাক বিপর্যয়ের জীবন্ত সাক্ষী টনি ব্লেয়ারের (যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) বক্তব্য শোনেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে ‘গাজা, এই অঞ্চল এবং বৃহত্তর বিশ্বের জন্য সেরা—কার্যত একমাত্র আশা’ বলে ঘোষণা করেছিলেন ব্লেয়ার।

কেন এই হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান হুমকি—এর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না থাকার মধ্যে এই হামলা জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হামলার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না দেখিয়ে ঢালাও মন্তব্য করেছেন। তিনি তেহরানের নেতৃত্বকে ‘একদল অত্যন্ত কঠোর ও ভয়াবহ মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ বছরের শত্রুতার কথা বলেছেন।

গত প্রায় অর্ধশতাব্দীর মধ্যে ইরানকে সম্ভবত এখনই সবচেয়ে কম হুমকি হিসেবে দেখা যায়। গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং দশকের পর দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটে সৃষ্ট গণবিক্ষোভ ইরানকে অনেকটাই দুর্বল করে ফেলেছে।

শান্তির প্রবক্তা থেকে ট্রাম্প কেন যুদ্ধংদেহী প্রেসিডেন্টে পরিণত হলেন, তা পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিজ দেশে তিনি নানা প্রতিকূলতার মুখে আছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। পররাষ্ট্রনীতিতে নিজের প্রিয় ‘ট্যারিফ’ বা শুল্ক আরোপের ক্ষমতার বিষয়ে সাধারণত বন্ধুসুলভ সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে তিনি তিরস্কার পেয়েছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বাণিজ্যসচিব উইলবার রস মনে করেন, আদালতের এই পরাজয় ইরানের ওপর হামলার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না তিনি এই হার মেনে নিতে পারছেন। এরপর আবার ইরানের বিষয়ে পিছিয়ে আসছেন, এমনটাও তিনি দেখাতে চাইবেন না।’

এদিকে কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের শিশু পাচারসংক্রান্ত নথি প্রকাশ ঠেকাতে বিচার বিভাগ আপ্রাণ চেষ্টা করলেও ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্ক ঘিরে সন্দেহ কাটেনি।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে ‘এমএস নাউ’ টেলিভিশনকে ডেমোক্র্যাট সিনেটর চাক শুমার বলেছিলেন, ‘আমি সত্যিই চিন্তিত, কারণ তিনি যখন এমন বিপদে পড়েন, তখন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। আমি উদ্বিগ্ন যে তিনি ইরানের বিষয়ে কী করে বসেন—কে জানে!’

আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের দলের পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেললেন।
ইতিহাস বলে, শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো অত্যন্ত কঠিন। এখন তেহরান সরকারের কাছে এটি স্পষ্ট যে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছে। ফলে তারা তাদের হাতে থাকা সবটুকু শক্তি দিয়ে আক্রমণকারীদের সর্বোচ্চ ক্ষতি করার চেষ্টা করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

  • জুলিয়ান বোর্গার, সিনিয়র ইন্টারন্যাশনাল করেসপনডেন্ট, দ্য গার্ডিয়ান