ইরাকের মরুভূমিতে মাসের পর মাস ছিল ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি, কীভাবে ফাঁস হলো সেই খবর
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে ইসরায়েলের আরও একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি থাকার তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ৩ মার্চ এক মেষপালক আওয়াদ আল-শাম্মারি দুর্ঘটনাক্রমে একটি ঘাঁটির কাছে গেলে ইসরায়েলি হেলিকপ্টার থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গোপন ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হতো। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে জানলেও ইরাককে জানায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। আরও গোপন ঘাঁটি থাকতে পারে বলে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।
দিনটি ছিল ৩ মার্চ, স্থানীয় সময় বেলা প্রায় ২টা। একটি পিকআপ ট্রাক ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমি দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যাচ্ছে। মরুভূমিতে বসবাস করা স্থানীয় বেদুইন বসতির কাছে সেটি পরিচিত এক দৃশ্য। পিকআপটি স্থানীয় এক মেষপালকের। তিনি বাজার করতে কাছের শহর আল-নুখাইবে যাচ্ছিলেন।
তবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই পিকআপটি ফিরে আসে, যা একেবারেই অস্বাভাবিক ছিল। ফিরে আসার সময় সেটিতে আগুন জ্বলছিল এবং গুলিতে সেটি ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল।
তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে (পিকআপ) ধাওয়া করছিল এবং বারবার গুলি চালাচ্ছিল, একপর্যায়ে সেটি মরুভূমিতে বালুর মধ্যে থেমে যায়। সেটিতে তখনো আগুন জ্বলছিল।
ইরাকের মরুভূমিতে প্রাণঘাতী এই হামলা নিয়ে আগে কখনো কোথাও খবর প্রকাশ পায়নি। ট্রাকটি ২৯ বছর বয়সী আওয়াদ আল-শাম্মারির।
শাম্মারির চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, তাঁর ভাই আওয়াদ ট্রাকটি নিয়ে বাজার করতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পথ চলতে গিয়ে তিনি অজান্তে ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে স্থাপন করা একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির মুখোমুখি পড়ে যান। অত্যন্ত গোপনীয় এবং দারুণভাবে সুরক্ষিত ওই সামরিক আস্তানার কাছাকাছি চলে যাওয়ার কারণেই আওয়াদকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে বিশ্বাস তাঁর পরিবারের।
আওয়াদ আল-শাম্মির কারণেই শেষ পর্যন্ত থলের বিড়াল বের হয়ে আসে। জানা যায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল তাদের শত্রুদেশ ইরাকের ভেতরে দুটি গোপন সামরিক স্থাপনা থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে।
দুর্ভাগ্যজনক সেই যাত্রা শুরুর পর থেকে ভয়াবহ পরিণতির আগে কোনো একসময় আওয়াদ ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি যা দেখেছিলেন, তা জানাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ওই মেষপালক বলেছিলেন, সেখানে একটি উড়োজাহাজ ওঠা-নামার পথ এবং সেটি ঘিরে সেনা, হেলিকপ্টার ও তাঁবুর সমাবেশ রয়েছে।
জ্যেষ্ঠ ইরাকি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, বাগদাদের আঞ্চলিক মিত্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে একটি ঘাঁটি পরিচালনা করছিল।
এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের একটি সামরিক ফাঁড়ি থাকার খবর প্রকাশ করে। ইরাকি কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে আওয়াদের আবিষ্কার করা সামরিক স্থাপনাটি ইসরায়েলের দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ আল-শাম্মারি যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধেরও আগে তৈরি। ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে ঘাঁটিটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
তাঁর চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, তাঁর ভাই আওয়াদ ট্রাকটি নিয়ে বাজার করতে বের হয়েছিলেন। কিন্তু পথ চলতে গিয়ে তিনি অজান্তে ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে স্থাপন করা একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির মুখোমুখি পড়ে যান। অত্যন্ত গোপনীয় এবং দারুণভাবে সুরক্ষিত ওই সামরিক আস্তানার কাছাকাছি চলে যাওয়ার কারণেই আওয়াদকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে বিশ্বাস তাঁর পরিবারের।
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা আরও বলেন, দেশের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল বেছে নিয়ে ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইসরায়েল অস্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তুতি শুরু করে, যাতে ভবিষ্যৎ সংঘাতের সময় অভিযান চালানোর জন্য সেগুলো ব্যবহার করা যায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের এই ফাঁড়ি ও ঘাঁটি এবং আওয়াদ আল-শাম্মারির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য করা একাধিক অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়াদ হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছেন।
ইসরায়েলি ঘাঁটিগুলো নিয়ে যেসব কর্মকর্তা কথা বলেছেন, তাঁদের অধিকাংশই এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল নিরাপত্তা বিষয় হওয়ায় নিজেদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে তাঁরা যে তথ্য দিয়েছেন, তা ইঙ্গিত করে যে অন্তত একটি ঘাঁটি, যেটিতে আওয়াদ হঠাৎ করে পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেটির বিষয়ে ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই অথবা তারও আগে থেকে ওয়াশিংটনের কাছে তথ্য ছিল।
এর অর্থ দাঁড়ায়, বাগদাদের অন্য প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এ বিষয়ে ইরাককে কোনো তথ্য দেয়নি। তাদের শত্রু বাহিনী যে গোপনে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করেছে, এটা ওয়াশিংটন বাগদাদকে জানতে দেয়নি।
ইরাকের পার্লামেন্ট সদস্য ওয়াদ আল-কাদু বলেন, ‘এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, দেশটির সরকার ও তার বাহিনীগুলোর পাশাপাশি ইরাকি জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা প্রদর্শন করার শামিল।’
আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরাকের নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইসরায়েলের সেই হিসাব-নিকাশের অংশ ছিল, যার ভিত্তিতে ইসরায়েল ধরে নিয়েছিল, ইরাকে গোপনে সামরিক আস্তানা গড়ে সেখান থেকে সামরিক অভিযান চালানো তাদের জন্য নিরাপদ হবে।
দুজন ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছর জুনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং চলমান সংঘাত—উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের উড়োজাহাজগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে ইরাককে তাদের রাডার বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল। এর ফলে বাগদাদ শত্রুর তৎপরতা শনাক্তের জন্য আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
ইসরায়েলের এসব ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো মরুভূমির এক মেষপালকের নজরে পড়ার আগপর্যন্ত সত্যিই কি ইরাকি বাহিনী নিজেদের ভূখণ্ডে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি জানত না? নাকি তারা জানত, কিন্তু উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?
যেকোনো সম্ভাবনাই এই ইঙ্গিত করে, দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের টানাপোড়েনে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি।
আল-কাদু বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে আমাদের নিরাপত্তা নেতৃত্বের অবস্থান অত্যন্ত লজ্জাজনক।’
‘এর আগে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের একটি সামরিক ফাঁড়ি থাকার খবর প্রকাশ করে। ইরাকি কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে আওয়াদের আবিষ্কার করা সামরিক স্থাপনাটি ইসরায়েলের দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি।’
এ নিয়ে ইরাকি সেনাবাহিনীর ওয়েস্টার্ন ইউফ্রেতিস ফোর্সেসের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের এই আবিষ্কারের এক মাসের বেশি সময় আগে থেকে তাঁর বাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সন্দেহ করে আসছিল।
আল-হামদানি বলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত ইরাক সরকার এ নিয়ে নীরব।
ইরাকের সরকার এখন পর্যন্ত তাদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। এটি স্বীকার করা তাদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরাকের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবে দেখে।
ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইরাকের কাছে ‘কোনো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।’
মরুভূমিতে ইসরায়েলের ঘাঁটির উপস্থিতির তথ্য প্রকাশের পর ইরাকে ক্ষোভ বাড়ছে। ফলে দেশটিতে ইরানের প্রভাব সীমিত করার যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আঞ্চলিক দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, আওয়াদ যে ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, সেটি ইসরায়েলের বিমানবাহিনীকে অভিযানে সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ ও চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হতো।
এসব ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল, যাতে ইসরায়েলি উড়োজাহাজগুলোকে ইরান পর্যন্ত পৌঁছাতে যে দূরত্ব অতিক্রম করতে হতো, তা কমানো যায়। এটি মূলত সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য একটি অস্থায়ী উপস্থিতির কথা মাথা রেখে তৈরি করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল বলে জানান দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেছিলেন, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ‘বিমানবাহিনী এবং স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় ও প্রতারণামূলক কৌশলের কারণে’ ইসরায়েলি অভিযানে সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযান তদারকির দায়িত্বে থাকা পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি অভিযানের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এ বিষয়ে প্রশ্নগুলো ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে পাঠাতে বলেছে।
তবে সাবেক শীর্ষ মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগনের কর্মকর্তারা এবং ওই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন কূটনীতিকেরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজেদের ভেতর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তাতে সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে কিছুই জানে না—এটা কল্পনাতেও বিশ্বাস করা অসম্ভব।
তাঁরা যে তথ্য দিয়েছেন, তা ইঙ্গিত করে যে অন্তত একটি ঘাঁটি, যেটিতে আওয়াদ হঠাৎ পৌঁছে গিয়েছিলেন, সেটির বিষয়ে ২০২৫ সালের জুন মাস থেকেই অথবা তারও আগে থেকে ওয়াশিংটনের কাছে তথ্য ছিল।
বিপজ্জনক গোপন তথ্য যেভাবে ফাঁস হলো
ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ডার জেনারেল আল-হামদানি দাবি করেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমির বেদুইন সম্প্রদায়গুলো কয়েক সপ্তাহ ধরে আঞ্চলিক কমান্ডকে সেখানে অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতার বিষয়ে নানা খবর দিচ্ছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী কাছাকাছি না গিয়ে বরং দূর থেকে ‘সম্ভাব্য ইসরায়েলি বাহিনীর সন্দেহজনক তৎপরতার ওপর নজরদারির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল’।
তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে এ বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছিল, কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।
আওয়াদ আল-শাম্মারি যেদিন বিদেশি বাহিনীর মুখোমুখি হন, সেদিন তিনিও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চাচাতো ভাই এবং কারবালা আঞ্চলিক অপারেশন কমান্ডের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ফাহিম আল-গুরাইতি।
তার কিছু সময় পর জেনারেল আল-গুরাইতি ও আওয়াদ আল-শাম্মারির পরিবারের সদস্যরা জানান, সেনাবাহিনী ও তাঁর স্বজনেরা তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। তাঁর পরিবার দুই দিন ধরে খোঁজাখুঁজি করে, এরপর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা বেদুইন বাসিন্দাদের সন্ধান পায়। তাদের কাছ থেকে তাঁরা আওয়াদের শেষ পরিণতির কথা জানতে পারে, জানতে পারে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল।
আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, আওয়াদের পিকআপের মতোই দেখতে একটি পুড়ে যাওয়া পিকআপ ট্রাক সেখানে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ সেখানে যাওয়ার সাহস করেনি। আমরা সেখানে গিয়ে পোড়া ট্রাক ও পুড়ে যাওয়া মরদেহ দেখতে পাই।’
আওয়াদের পরিবার তাঁর রক্তাক্ত ও পোড়া মরদেহের ছবি দেখিয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, তাঁর মাথা ও আঙুল পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ছবিতে পোড়া পিকআপও দেখা যাচ্ছে।
জেনারেল আল-গুরাইতি ও জেনারেল আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের কাছ থেকে খবর পাওয়ার এক দিন পর ইরাকের আঞ্চলিক কমান্ড একটি পুনর্বীক্ষণ দল সেখানে পাঠায়।
তারও এক দিন পর ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ডের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ইউনিটগুলো এলাকাটির কাছে পৌঁছালে তারা গোলাগুলির মুখে পড়ে। এতে এক সেনা নিহত এবং দুজন আহত হন, দুটি যানবাহনে বোমা হামলা চালানো হয়। এরপর ইউনিটগুলো সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
বাগদাদে ইরাকের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখনো বোঝার চেষ্টা করছিলেন, সেখানে আসলে কী ঘটেছিল।
দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা বারবার ব্যাহত হয়। শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা ঘটনাটিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি বা এর গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছিলেন।
এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, দেশটির সরকার ও তার বাহিনীগুলোর পাশাপাশি ইরাকি জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা প্রদর্শন করার শামিল।ওয়াদ আল-কাদু, ইরাকের পার্লামেন্ট সদস্য
সেনাদের ওপর হামলা ও সেনা হতাহতের ঘটনার পর জনসমক্ষে ইরাকের জয়েন্ট অপারেশনস কমান্ড জানিয়েছিল, ‘বিদেশি’ বাহিনী তাদের সেনাদের ওপর হামলা চালিয়েছে এবং তারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এ নিয়ে অভিযোগ করেছে।
আর ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল-আমির ইয়ারাল্লাহ গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বলে জানান জেনারেল আল-হামদানি এবং দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী নিশ্চিত করেছিল, ওই কাজ তাদের বাহিনীর নয়, ওটা মার্কিন বাহিনী নয়। তখন আমরা বুঝতে পারি, এটি ইসরায়েলি বাহিনী ছিল।’
ইরাকি সেনাদের ওপর হামলার চার দিন পর, ৮ মার্চ ইরাকি পার্লামেন্ট সামরিক নেতৃত্বকে একটি গোপন ব্রিফিং আয়োজনে বাধ্য করে। ওই ব্রিফিংয়ে উপস্থিত পার্লামেন্ট সদস্যরা জানান, তাঁরা এর বিস্তারিত প্রকাশ করতে পারেননি। তবে তাঁদের একজন হাসান ফাদাম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ইসরায়েল ইরাকের ভেতরে অন্তত আরও একটি ফাঁড়ি স্থাপন করেছিল।
হাসান ফাদাম বলেন, আল-নুখাইবেরটি সেই ঘাঁটিগুলোর একটি, শুধু এটির অবস্থান ফাঁস হয়েছে।
আরেক ইরাকি কর্মকর্তা দ্বিতীয় ঘাঁটির অস্তিত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে সেটির অবস্থান সম্পর্কে আলাদা কিছু জানাননি। শুধু বলেছেন, সেটিও দেশটির পশ্চিমের মরুভূমি অঞ্চলে অবস্থিত।
সাবেক ও বর্তমান দুজন জ্যেষ্ঠ ইরাকি কর্মকর্তা বলেন, সরকারি প্রটোকল অনুযায়ী ইরাকি ভূখণ্ডে কোনো কার্যক্রম চালালে তা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বাগদাদকে জানানো বাধ্যতামূলক।
ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, এর অর্থ দাঁড়ায়, ওয়াশিংটন হয় ইসরায়েলি কার্যক্রম গোপন রেখেছিল অথবা ইরাকের শীর্ষ কমান্ডকে জানানো হয়েছিল, তারা তা গোপন রেখেছিল।
তবে কর্মকর্তারা এ–ও বিশ্বাস করেন, মরুভূমির ওই মেষপালক ঘটনাটি প্রকাশ করার আগপর্যন্ত ইরাকি নেতৃত্ব বিদেশি সামরিক বাহিনীর ওই উপস্থিতি যে ইসরায়েলি বাহিনী ছিল, তা তারা জানত—এমনটা প্রায় অসম্ভব। বরং খুব সম্ভবত তারা সেটিকে মার্কিন ঘাঁটি বলে ধরে নিয়েছিল।